সংবাদপত্রের নায়ক!

প্রকাশিত : ১৯ জানুয়ারি ২০২৩

শাহ মতিন টিপু

সংবাদপত্র বা খবরের কাগজ হলো একটি লিখিত প্রকাশনা যার মধ্যে থাকে বর্তমান ঘটনা, তথ্যপূর্ণ নিবন্ধ, সম্পাদকীয়, বিভিন্ন ফিচার এবং বিজ্ঞাপন। এটি সাধারণত স্বল্প-মূল্যের কাগজে মুদ্রণ করা হয় যেমন নিউজপ্রিন্ট। পৃথিবীর আধুনিক বিপ্লব ও সংগ্রামের ইতিহাসে সংবাদপত্রের ভূমিকা অনেক। যদিও ডিজিটাল দুনিয়ার এ সময়ে সংবাদপত্রে অনেককিছুই পাল্টে যাচ্ছে।
এক হিসেবে দেখা যায়, বাংলা ভাষায় সংবাদপত্র প্রকাশনার দু’শ বছর পার হয়ে গেছে। ১৮১৮ সালের ১৫ মে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিলো সাপ্তাহিক সংবাদপত্র ‘বঙ্গাল গেজেটি’। অবিভক্ত ভারতে প্রথম সংবাদপত্র ইংরেজি ভাষায়। ১৭৮০ সালে ‘বেঙ্গল গেজেট’ নামের ইংরেজি সংবাদপত্রটি প্রকাশ করেন জেমস্ অগাস্টাস হিকি। তার ঠিক ৩৮ বছর পরে ১৮১৮ সালের ১৫ মে গঙ্গাকিশোর প্রকাশ করেন বাংলা ভাষার প্রথম সংবাদপত্র ‘বঙ্গাল গেজেটি’। প্রায় একই সময়ে ১৮১৮ সালের ২৩ মে একটি ব্যপটিস্ট মিশন থেকে জন ক্লার্ক মার্শম্যান প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক ‘সমাচার দর্পণ’। এই পত্রিকাটিকে সরকারিভাবেই বলুন অথবা ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিকোণ থেকেই বলুন আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলার প্রথম সংবাদপত্রের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর কারণ হচ্ছে, আশ্চর্যজনকভাবে গঙ্গাকিশোর সম্পাদিত বাংলা ভাষার প্রথম সংবাদপত্রের কোন কপি আজও অবধি পাওয়া যায়নি। যা হোক, দু’শ বছর পার হয়ে এসে বর্তমান ডিজিটাল সময়ের স্রোতে সংবাদপত্রও যে ভাসবে- সেটাইতো স্বাভাবিক। সংবাদপত্র তো সময়কেই ধারণ করে, এর ব্যত্যয় তো নয়!
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা- নিয়ে আজকাল খুব বেশিই আলোচনা হচ্ছে। আমিও মানি- এই নীতিটি যে মুদ্রিত এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার ও মত প্রকাশে অধিকার হিসাবে বিবেচিত হওয়া উচিত। সময় যতো পার হচ্ছে, ততোই বিষয়টি বিবেকে সোচ্চার হচ্ছে। কারণ, দুর্নীতি পরায়ণরা সবসময়ই নিজের অপকর্ম ঢাকতে সংবাদপত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবেন, কর্মীদের বাধাগ্রস্ত করতে চাইবেনই। যদিও জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে: প্রত্যেকের মতামত ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে; এই অধিকারে হস্তক্ষেপ ছাড়াই মতামত রাখা, এবং কোনও গণমাধ্যমের মাধ্যমে তথ্য ও ধারণাগুলি অনুসন্ধান করা, গ্রহণ এবং গ্রহণের স্বাধীনতার সীমানা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত।
এক তথ্যে দেখা যায়, সুইডেন বিশ্বের প্রথম দেশ যেটি ১৭৬৬ সালের ফ্রিডম অফ প্রেস অ্যাক্টের মাধ্যমে প্রেসের স্বাধীনতাকে তাদের সংবিধানে সংরক্ষণ করেছিলো। ২০১৬ সালে, যে দেশগুলোতে প্রেস সবচেয়ে বেশি স্বাধীন ছিলো তা হলো- ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, ডেনমার্ক এবং নিউজিল্যান্ড, কোস্টারিকা, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, আয়ারল্যান্ড এবং জামাইকা । সর্বনিম্ন প্রেসের স্বাধীনতার দেশটি ছিল ইরিত্রিয়া, তারপরে উত্তর কোরিয়া, তুর্কমেনিস্তান, সিরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম এবং সুদান।
বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র দাবিদার ভারতে গণমাধ্যমের সমস্যা প্রচুর। কানাডিয়ান জার্নালিস্টস ফর ফ্রি এক্সপ্রেশন (সিজেএফই) ভারতকে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, ভারতীয় সাংবাদিকরা বাধ্যতামূলক হয় বা চাকরির সুরক্ষার প্রয়োজনে বাধ্য হন অনেক সংবাদ এড়িয়ে চলতে। তারা শুধুমাত্র এমনভাবে রিপোর্ট করতে পারেন যা অংশীদারদের রাজনৈতিক মতামত এবং কর্পোরেট স্বার্থকে প্রতিফলিত করে। এই নিরিখে হয়তো আমরা আমাদেরকেও ফেলতে পারি। বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগত কি এর বাইরে? সে প্রশ্নটা না হয় আমি শ্রদ্ধাভাজন পাঠক সমীপে রাখলাম।
আজকাল দৈনিক সংবাদপত্রে ‘বার্তা সম্পাদক’ (নিউজ এডিটর) পদটি তেমন আলাদাভাবে চোখে পড়ে না। সংবাদপত্রের প্রধান চরিত্র এখন সম্পাদক নিজেই। নানা কারণে প্রায় প্রতিটি দৈনিক পত্রিকায় এখন সম্পাদক বা নির্বাহী সম্পাদকই পত্রিকার প্রতিদিনের সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে থাকেন। অথচ পাকিস্তান আমলে তো বটেই, স্বাধীনতার পরেও প্রায় এক দশক সংবাদপত্রে বার্তা সম্পাদকের প্রবল দাপট ছিল। সংবাদপত্রের সোনালি যুগ ছিল গত শতকের ষাটের দশক। সম্পাদকের তালিকা দেখুন: মওলানা আকরম খাঁ, মুজীবর রহমান খাঁ, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, আবদুস সালাম, জহুর হোসেন চৌধুরী। বার্তা সম্পাদকের তালিকায় ছিলেন- সিরাজুদ্দীন হোসেন, এবিএম মূসা, তোয়াব খান, সন্তোষ গুপ্ত। সিনিয়র সাংবাদিক ছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত, শহীদুল্লা কায়সার, আহমেদুর রহমান, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, কে জি মুস্তফা, হাসান হাফিজুর রহমান, নির্মল সেন, আহমেদ হুমায়ুন, বজলুর রহমান প্রমুখ। এরপর বার্তা সম্পাদক হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলেন আসাফউদ্দৌলা রেজা, ফওজুল করিম, কামাল লোহানী।
ষাটের দশকে সফল সংবাদপত্রগুলোর দিকে ফিরে তাকালে দেখতে পাবেন- প্রতিটি সংবাদপত্রের পেছনেই ছিলো একেকটি দক্ষ টিম। যারা পাঠক চাহিদা নিয়ে ভাবতেন, আর সেসব পরিবেশনের মাধ্যমে পাঠকমহলে সাড়া জাগাতেন।
পত্রিকায় রিপোর্টের জন্য কী ধরনের এক্সক্লুসিভ বিষয় হতে পারে, সেই রিপোর্টে কী কী তথ্য থাকা উচিত, রিপোর্টের জন্য কার কার সঙ্গে দেখা করা উচিত, কোন বইয়ে বা জার্নালে আরও তথ্য থাকতে পারে ইত্যাদি খুঁজতেন। নানাভাবে ব্রফিং করতেন রিপোর্টারদের। শুধু রিপোর্ট নয়, ফিচারের জন্যও নানা বিষয় প্রস্তাব করতেন। রিপোর্ট বা ফিচারের আকর্ষণীয় হেডলাইন, এডিটিং, মেকআপে ছবি নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা- এসবে থাকতো চমকের পর চমক। সংবাদপত্রে অনেক নেপথ্য সাংবাদিক থাকেন, যাদের পাঠকেরা তেমন চেনেন না। তারা বার্তা সম্পাদক, সাব-এডিটর, কপি-এডিটর, সম্পাদনা সহকারী ইত্যাদি। অথচ একটি সংবাদপত্রকে পাঠকনন্দিত করার পেছনে এদের অবদানই আসল।
আমাদের সাংবাদিকতা জগতে অনেক কৃতী পুরুষ এসেছেন। তাদের অবদান আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। তাদের অনেকের নামের সঙ্গে পাঠকসমাজ পরিচিত। সংবাদপত্রে বিশেষ রিপোর্ট বা কলাম না লিখলে পাঠকেরা সাংবাদিকদের চেনেন না। ইদানীং টিভির টক শোর কল্যাণে অনেক সাংবাদিক বিশেষ পরিচিতি ও খ্যাতি লাভ করেছেন। কিন্তু সংবাদপত্রে এমন অনেক সাংবাদিক নেপথ্যে কাজ করেন, যাদের প্রতিভা ও অবদানের ওপর ভিত্তি করে একটি সংবাদপত্র বিকশিত হয়। পাঠকনন্দিত হয়। অথচ এই নেপথ্য সাংবাদিকেরা তেমন স্বীকৃতিও পান না। ট্রাজেডি এই যে, প্রতিটি দৈনিক পত্রিকায় নেপথ্যচারী যে সাংবাদিকদের হাত দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য খবর ছাপা হয়। মৃত্যুর পর একটা সিঙ্গেল কলাম সংবাদের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ইতি ঘটে। শুধু পরিবার ও সহকর্মীদের মধ্যেই বেঁচে থাকে তাদের স্মৃতি।

আপনার মতামত লিখুন :