দরবারে সালতানাত ‘সুলতান সুলেমান’ দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট

প্রকাশিত : ৫ জুন ২০২২

মো. খবির উদ্দিন

অটোম্যান স্বর্ণযুগের মহানায়ক সুলতান সুলেমান। নিজের যোগ্যতাবলে তিনি অনেক বিশেষণ কুড়িয়েছেন। ভূষিত হয়েছেন তিনি ‘সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট’ আবার কোথাও ‘কানুনে সুলতান’ আবার কোথাও তিনি ‘সুলেমান দ্য ল গিভার’ এবং আরব বিশ্বে তিনি ‘সুলেমান আল মুহতাশাম’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বাবার আদরের সন্তান ছিলেন সুলেমান। বাবা সেলিম ছিলেন অটোম্যানের নবম সম্রাট (প্রথম খলিফা) এবং এশিয়া ও আফ্রিকায় একচ্ছত্র অধিপতি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অটোম্যানদের। পুত্র সুলেমান ইউরোপে নিজেদের শক্তিশালী ও উন্নত করে অটোম্যান মহাকাব্যের বাকি অংশ সমাপ্ত করলেন। সুলেমান পিতার একান্ত সান্নিধ্যে বেড়ে উঠায় ইলম, আদব, আলেম, সাহিত্যিক এবং ফকিহগণের প্রতি ভালোবাসা লালন করেন এবং যৌবনের প্রারম্ভ থেকেই গাম্ভীর্য এবং শ্রেষ্ঠত্বে সর্বজনবিদিত হয়ে ওঠেন। জীবনের ২৬তম বসন্তে এসে তিনি ক্ষমতার সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি তাঁর সকল কাজে ছিলেন ধীরস্থির। কোন কাজে তাড়াহুড়া করতেন না, বরং গভীরভাবে চিন্তা-ফিকির করে তিনি সিদ্ধান্ত নিতেন। কোন ব্যাপারে একবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে তিনি তা আর ফিরিয়ে নিতেন না। অটোম্যান সাম্রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে মহৎ শক্তিশালী কানুন প্রণেতা সুলতান সুলেমান। সুলেমানের জন্ম ১৪৯৪ সালের ৬ নভেম্বর তুরস্কের ট্রাবজোনে। অটোম্যান সাম্রাজ্যের নবম সুলতান সেলিমের একমাত্র জীবিত পুত্র তিনি। মা আয়েশা হাফসা সুলতান ছিলেন ক্রিমিয়ার ধর্মান্তরিত মুসলিম। হাতেখড়ি হয়েছিল দাদি গুলবাহার খাতুনের কাছে। তারপর মাত্র সাত বছর বয়সেই ইস্তাম্বুলে তোপকাপি প্রাসাদের রাজকীয় পাঠশালায়। মেধার পরিচয় পাওয়া যায় দ্রুতই। খায়রুদ্দীন খিজির এফন্দির তত্ত্বাবধানে ঘুরে আসেন বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য যুদ্ধবিদ্যা ও ধর্মতত্ত্বের চৌহদ্দি। বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান লাভের পাশাপাশি ছয়টি ভাষায় দক্ষতাও অর্জিত হয়- অটোম্যান তুর্কি, আরবি, সার্বিয়ান, চাগতাই তুর্কি, ফারসি ও উর্দু।

পিতা সেলিম মাত্র পনের বছর বয়সেই পুত্র সুলেমানকে ইস্তাম্বুলের প্রাদেশিক শাসনকর্তার ভার প্রদান করেন। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। নিজের যোগ্যতায় সুলেমান অর্জন করলেন আনাতোলিয়া ও মিসরের শাসনকর্তার পদ। সিংহাসনে বসার আগ থেকেই ঈর্ষণীয় রকমের জনপ্রিয় ছিলেন সুলেমান। পিতার মৃত্যুর পরে সুলেমানকে ইস্তাম্বুলে ডাকা হয়। ১৫২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর দশম উসমানীয় সুলতান ও দ্বিতীয় উসমানীয় খলিফা হিসেবে সুলতান সুলেমান সিংহাসনে আরোহণ করেন। মা থাকেন পরামর্শক হিসেবে। মৃত্যুর আগে সেলিম আটোম্যান সাম্রাজ্যকে স্থিতিশীল একটা ভিতের উপর দাঁড় করিয়ে যান। ভূমধ্যসাগরীয় অর্থনীতি, এশিয়া ও আফ্রিকার রাজনীতি, এমনকি ধর্মের ক্ষেত্রে প্রাধান্য নিশ্চিত হয়। সুলেমান পিতার সাথেই ছিলেন পুরো সময়। তাই হয়ত বুঝতে ভুল করেননি পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা ঠিক করতে। বলা হয় খুব বিপজ্জনক গতিতে সুলেমান তার রাজত্ব শুরু করেন। বেলগ্রেড, রোডস এবং হাঙ্গেরি একে একে অনুগত করেন।

পিতার উত্তরাধিকারী হওয়ার পর সুলেমান একের পর এক সামরিক বিজয় শুরু করেন। সুলেমান দ্রুতই হাঙ্গেরি রাজ্য থেকে বেলগ্রেড অবরোধের প্রস্তুতি নেন – যা এই অঞ্চলে জন হুলিয়াদির শক্তিশালী প্রতিরক্ষার কারণে তাঁর প্রপিতামহ দ্বিতীয় মেহমেদ অর্জন করতে ব্যর্থ হন। হাঙ্গেরিয়ান এবং ক্রোসেটদের অপসারণের জন্য এটি দখল করা অত্যাবশ্যক ছিল, কেননা আলবেনিয়ান, বসনিয়া, বুলগেরিয়ান, বাইজেন্টাইন এবং সার্বদের পরাজয়ের পরে ইউরোপে উসমানীয়দের বিজয় ঠেকাতে পারা একমাত্র শক্তিশালী শক্তি হিসেবে তারাই রয়ে গিয়েছিল। সুলেমান তাঁর রণকৌশল ব্যবহার করে ১৫২১ সালে তার পতন ঘটান। খ্রিস্টান জগতের বৃহত্তর শক্তিশালী কেল্লার পতনের ফলে পুরো ইউরোপজুড়ে ভীতিসঞ্চার হয়ে পড়ে। এ বিজয়ের ফলে হাঙ্গেরি এবং অস্ট্রিয়ার রাস্তা খুলে যায়।

সুলেমান ২৯ আগস্ট ১৫২৬-এ মোহাকমের যুদ্ধে হাঙ্গেরির রাজা লুই ২য় কে (১৫০৬-১৫২৬) পরাজিত করেন। রাজা লুইয়ের নিষ্প্রাণ দেহ মহান সুলতান সুলেমানের সামনে রাখা হলে, তিনি দুঃখভরে বলেন, “আমি সত্যিই তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র হয়ে এসেছি, কিন্তু আমার ইচ্ছা তো এটা ছিল না যে, তাকে পুনরায় প্রাণভিক্ষা আর রাজকীয়তার মিষ্টি স্বাদ দেওয়ার আগেই সে এভাবে মস্তকবিহীন হয়ে যাবে।” হাঙ্গেরীর বাহিনী পতনের মধ্য দিয়ে উসমানীয় সাম্রাজ্য ইউরোপের সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তিতে পরিণত হয়। হাঙ্গেরীর উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা সুলেমানের দরবারে প্রস্তাব দাখিল করেন যে, যেহেতু লুই উত্তরাধিকারী ছাড়া মারা গিয়েছে, তাই হ্যাবসবার্গরা হাঙ্গেরীর সিংহাসন গ্রহণ করবে। কিন্তু হাঙ্গেরীয়রা আবার অশান্ত হয়ে উঠলে সুলেমান ১৫২৯ সালে দানিউব উপত্যকা দিয়ে অগ্রসর হন এবং বুদার নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেন। সুলেমানের সেনাবাহিনী পূর্ণ রোমান সাম্রাজ্য এবং সুবিশাল হাঙ্গেরির পতন ঘটায়। সুলতান সুলেমান মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ অঞ্চল দখল করে নেন। তিনি উত্তর আফ্রিকায় আলজেরিয়া ও লিবিয়াসহ বড় বড় অঞ্চলগুলো দখল করেন। তাঁর শাসনামলে অধীনস্থ কাপুদান পাশা খিজির খাইরুদ্দিন বারবারোসা স্পেনের অ্যাডমিরাল আন্দ্রে দোরিয়ার নেতৃত্বে সম্মিলিত খ্রিস্টান বাহিনীর বিরুদ্ধে ১৫৩৮ সালে প্রিভিজার যুদ্ধে বিজয় লাভ করে। এই নৌবাহিনী ভূমধ্যসাগর থেকে লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগর পর্যন্ত তাদের আধিপত্য বজায় রাখে। এ ছাড়াও তার নৌবাহিনী তৎকালীন স্পেনের হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাওয়া পলায়নরত নির্বাসিত মুসলিম ও ইহুদিদের উদ্ধারকার্য পরিচালনা করেন। সুলতান সুলেমান ছিলেন উসমানীয় সাম্রাজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান সুলতান। ১৫৪১ সালে হ্যাবসবার্গেরা বুদা অবরোধ করার চেষ্টা করে কিন্তু সুলতানের আক্রমণে তারা অপদস্থ ও বিতাড়িত হয়। ১৫৪১ এবং ১৫৪৪ সালে পরপর দুটি অভিযানে উসমানীয়রা প্রচুর হ্যাবসবর্গীয় দুর্গ দখল করে ফেলে। সম্মুখে বিশাল পরাজয় দেখে ফার্দিনান্দ এবং চার্লস সুলেমানের সাথে তড়িঘড়ি করে পাঁচ বছরের একটি অপমানজনক চুক্তি করতে বাধ্য হয়।

বাংলাদেশের ইতিহাস পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেছিলেন, রাজকাজ পরিচালনা করার জন্য যে প্রজ্ঞা এবং বিচক্ষণতা দরকার সেটা সুলতান সুলেমানের মধ্যে ছিল। “ইউরোপে সেই সময় তাঁর সমকক্ষ কোন শাসক ছিল না। আইন প্রণয়ন, শাসন বিধি প্রণয়ন, সামরিক সাফল্য, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সব মিলিয়ে তিনি ঐ সময়ের রাজন্যবর্গের মধ্যে ছিলেন অনন্য।” এইজন্য পশ্চিমারা তাঁকে ‘ম্যাগনিফিসেন্ট বা মহামতি’ বলতেন। আবার তুরস্কে তিনি ‘কানুনি সুলতান’ নামে পরিচিত ছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক সুলতানা সুকন্যা বাশার বলেছিলেন তিনি অসম্ভব দৃঢ়চেতা একজন মানুষ ছিলেন যার নমুনা দেখা গেছে বিভিন্ন যুদ্ধে তাঁর ভূমিকার সময়। তিনি বলেছিলেন, “অটোম্যানদের সাথে যখন পার্শ্ববর্তী দেশের যুদ্ধ হয়েছে, তখন তিনি তাঁর বাচনভঙ্গি, বক্তব্যের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর মনোবল দৃঢ়চিত্ত করেছেন”।

সুলেমান উসমানীয় সাম্রাজ্যের পুরাতন নীতিমালাগুলো পুনরায় সম্পূর্ণরূপে নবীনকরণ করেছিলেন। সুলতান সুলেমান ষোড়শ শতাব্দীর ইউরোপে একজন বিশিষ্ট সাম্রাজ্যধিপতি হিসেবে স্থান লাভ করেন, যার শাসনামলে উসমানীয় খেলাফতের সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির ব্যাপক বিস্তার ঘটে। উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিস্তারকালে, সুলতান সুলেমান ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সাম্রাজ্যের সমাজ ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, খাজনা ব্যবস্থাও অপরাধের শাস্তি ব্যবস্থার বিষয়গুলোতে আইন প্রণয়নসংক্রান্ত পরিবর্তন আনার আদেশ দেন। তিনি যেসব কানুনগুলো স্থাপন করে গেছেন, সেসব কানুনগুলো উসমানীয় সাম্রাজ্যে অনেক শতাব্দী ধরে প্রচলিত ছিল। সুলেমান যে শুধু একজন মহান রাজা ছিলেন তা নয়, তিনি একজন মহান কবিও ছিলেন। ‘মুহিব্বি’ নামক ছদ্ম উপনামে তুর্কি ও ফারসি ভাষায় বহু কালজয়ী কবিতা লিখেছেন। তাঁর শাসনামলে উসমানীয় সংস্কৃতির অনেক উন্নতি হয়।

উসমানীয় সংস্কৃতির নিয়ম ভঙ্গ করে, সুলেমান তাঁর হেরেমের রুখেনিয়ান বংশোদ্ভূত দাসী হুররামকে বিবাহ করেন। সে ছিল একজন অর্থোডস্ক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী, কিন্তু বিবাহের পূর্বেই সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেণ। প্রকৃতপক্ষে সুলতান রসুল (সা.) এর হাদিস মোতাবেক তাকে জ্ঞান ও শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়ে হাদিসের আদেশ মোতাবেক আজাদ করে দেন এবং পরবর্তীতে একজন মুক্ত নারী হিসেবে বিবাহ করেন। হুররাম, সুলতান সুলেমানের একাধিক পুত্রসন্তান ও একজন কন্যাসন্তানের মাতা। তাঁর গর্ভে শাহজাদা সেলিম জন্ম নেন। তিনি সুলতান সুলেমানের দীর্ঘ ৪৬ বছরের শাসনামলের পর তার স্থলাভিষিক্ত ও একাদশতম সুলতান পদে অধিষ্ঠিত হন। তাঁর অন্যান্য পুত্রগণ তাঁর মৃত্যুর পূর্বেই মারা যায়। তাই শাহজাদা সেলিমের কোন বাধা না থাকায় তিনিই সিংহাসনে আরোহণ করেন।

অটোম্যান সাম্রাজ্যের আইন ছিল শরীয়াহ বা পবিত্র আইন নির্ভর, যা ইসলামের ঐশ্বরিক আইন হওয়ায় তা পরিবর্তন করার ক্ষমতা সুলতানের হাতে ছিল না, কিন্তু কিছু স্বতন্ত্র ক্ষেত্রে সুলেমানের ইচ্ছার আওতাভুক্ত ছিল সেগুলো কানুন নামে পরিচিত। সেগুলো হলো ফৌজদারি আইন, জমির মেয়াদ এবং কর দেওয়ার মতো ক্ষেত্রগুলো। তিনি তাঁর পূর্ববর্তী নয়জন অটোম্যান সুলতানের জারি করা সমস্ত রায় সংগ্রহ করেন। পরস্পর বিরোধী বক্তব্যগুলো বেছে নিয়ে তিনি ইসলামের মৌলিক আইন লঙ্ঘন না হয় এমন সতর্কতাসহ একটি একক আইনি কোড জারি করেন। গ্রান্ড মুফতি সউদ এফেন্দি সমর্থিত এই কাঠামোর মধ্যেই সুলেমান দ্রুত বাড়ন্ত সাম্রাজ্যের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে আইনী সংস্কার করেছিলেন। কানুনি আইন যখন চূড়ান্ত রূপ লাভ করে তখন আইনের কোড কানুন-ই-ওসমানী নামে পরিচিত হয়। সুলেমানের এই আইন তিনশো বছরের বেশি সময় ধরে চালু ছিল।

সুলেমান নতুন ফৌজদারি এবং পুলিশ আইন প্রণয়ন করেন। নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য জরিমানা নির্ধারণ করেন এবং সেইসাথে মৃত্যু বা অঙ্গহানির মোকদ্দমাগুলো হ্রাস করার চেষ্ট করেন। কর আরোপের ক্ষেত্রে পশু, খনিজ, বাণিজ্যের মুনাফা এবং আমদানি-রপ্তানি শুল্কসহ বিভিন্ন পণ্য ও পণ্যের উপর কর আরোপ করা হয়। কর ছাড়াও যে কর্মকর্তারা দুর্নীতি করতেন তাদের জমি ও সম্পত্তি সুলতান কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়ে যেত।

সুলতানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল শিক্ষাক্ষেত্র। ধর্মীয় সংগঠনগুলোর অর্থায়নে মসজিদকেন্দ্রিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সেই সময়ের খ্রিস্টান দেশগুলোর তুলনায় বহু আগে থেকেই মুসলিম ছেলেদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদান কার্যক্রম চালু করে। রাজধানীতে সুলেমান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে চল্লিশটি করেন। সেখানে শিক্ষার্থীদের ইসলামী নীতির পাশাপাশি পড়ালেখা শেখান হতো। উচ্চ শিক্ষায় ইচ্ছুক যুবকরা আটটি মাদরাসা/কলেজ এর মধ্যে যে কোন একটিতে ভর্তি হতে পারত। এসব মাদরাসায় অধ্যয়নের জন্য যেসব বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল তা হলো ব্যাকরণ, অধিবিদ্যা, দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা এবং জ্যোতিষশাস্ত্র, বিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত, চিকিৎসাবিদ্যা, কোরআন, হাদিস, ফিকহ। উচ্চতর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বলা হতো মাদরাসা, যেখানকার স্নাতকোত্তীর্ণগণ ইমাম বা শিক্ষক হয়ে ছড়িয়ে পড়তেন। শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর বেশিরভাগই মসজিদের আঙ্গিনাজুড়ে তৈরি হতো। অনেকগুলো কমপ্লেক্সের সমন্বয়ে শিক্ষাকেন্দ্রগুলো ছিল। কমপ্লেক্সগুলোতে থাকত লাইব্রেরি, স্নানাগার, রান্নাঘর, বাসস্থান এবং জনসাধারণের সুবিধার জন্য হাসপাতাল ও মুসাফিরখানা।

সুলেমানের পৃষ্ঠপোষকতায়, উসমানীয় সাম্রাজ্য তার সাংস্কৃতিক বিকাশের স্বর্ণযুগে প্রবেশ করে। শত শত রাজকীয় শৈল্পিক সমাজের লোকজন (প্রতিভাবান সম্প্রদায়) রাজকীয় আসন, তোপকাপি প্রাসাদে সমাদৃত হয়েছিল। একটি শিক্ষানবিশ প্রোগ্রামের পর, শিল্পী এবং কারিগররা তাদের আপন আপন ক্ষেত্রে পদমর্যাদায় অগ্রসর হতে পারত এবং তাদের ত্রৈমাসিক-বার্ষিক কিস্তিতে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি দেওয়া হতো। টিকে থাকা বেতন রেজিস্টারগুলো আজও সুলেমানের শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষকতার বিস্তৃতির সাক্ষ্য দেয়। দরবারের কারিগরদের মধ্যে ছিল চিত্রকর বই বাঁধাইকারী, লোমের কারিগর, অলংকারিক এবং স্বর্ণকার। পূর্ববর্তী শাসকরা যেখানে পার্সিয়ান সংস্কৃতিতে প্রভাবিত ছিলেন সেখানে সুলেমানের শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষকতায় অটোম্যান সাম্রাজ্য তার নিজস্ব শৈল্পিকতায় জোরদার করেছে। সুলেমান নিজে একজন দক্ষ কবি ছিলেন, তিনি মুহিব্বি ছদ্মনামে ফারসি ও তুর্কি ভাষায় কবিতা লিখতেন। সুলেমানের কিছু কথা তুর্কি প্রবাদে পরিণত হয়ে গিয়েছে, তন্মধ্যে সুপরিচিত একটি হল ‘লক্ষ্য সবার এক হলে কী, গল্প কিন্তু বহু’।

সুলেমান তাঁর সাম্রাজ্যের মধ্যে একটি ধারাবাহিক স্থাপত্য উন্নয়নের পৃষ্ঠপোষকতা করার জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। সুলতান সেতু, মসজিদ, প্রাসাদ এবং বিভিন্ন দাতব্য ও সামাজিক স্থাপনাসহ একাধিক প্রকল্পের মাধ্যমে কনস্টান্টিনোপলকে ইসলামী সভ্যতার কেন্দ্রে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। এর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ নির্মাণ করেছিলেন সুলতানের প্রধান স্থাপতি মিমার সিনান, যার অধীনে অটোম্যান স্থাপত্য তার শীর্ষে পৌঁছেছিল। সুলেমানের সবচেয়ে বড় অবদান হল কাবাসহ মক্কা ও মদিনা সংস্কার। ইতিহাসমতে জানা যায়, সুলতান একদা রাতে স্বপ্ন দেখেন যে, রাসুল (সা.) তাকে বলছেন, তুমি বেলগ্রেড রোডস ও বাগদাদের জয়ের পর আমার মদিনাকে পুনঃনির্মাণ কর। শ্রীঘ্রই সুলতান দুটি পবিত্র মসজিদের জমি পুনর্গঠন এবং তাদের জন্য আবাসন প্রকল্পের উন্নয়নের আদেশ দেন। এমনকি তিনি তাঁর নিজের সম্পদ থেকে তীর্থযাত্রীদের পানির চাহিদা মেটানোর জন্য একটি দাতব্য এনডোমেন্ট প্রতিষ্ঠা করার অনুরোধ জানিয়ে একটি উইল রেখে যান। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর কন্যা মিহিরিমাহ সুলতান তাঁর ইচ্ছা পূরণ করেন এবং আইন জুবায়দা খনন করে আরাফাত থেকে মক্কা পর্যন্ত পানির বন্দোবস্ত করে দেন। এছাড়া সুলতান দামেস্কে একটি কমপ্লেক্স নির্মাণ করেন। জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদের ডোম অফ দ্য রক এবং জেরুজালেম শহরের দেয়াল সংস্কার করেন। বর্তমান আল-আকসা মসজিদ সুলেমানের সংস্কারের নমুনা।

উসমানী সাম্রাজ্যের শক্তি এবং তৎকালীন বিশ্বে তাদের অবস্থান বিবেচনায় সুলতান সুলেমানের সময়কাল ছিল পিরামিডের চূড়াতুল্য। সুলতান সুলেমানের সময়কালকে উসমানী সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৫২০-১৫৬৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ব্যাপী তাঁর শাসনকাল সাক্ষী হয়েছে এক বিশাল বিস্তৃতির। পূর্বের কোন শাসক এমনটি পারেননি। বিশ্বের তিনটি মহাদেশ তখন উসমানী সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। একজন শাসককে বিচার করা হয় তাঁর শাসন প্রক্রিয়া এবং কতটা মনোবল নিয়ে তিনি শত্রুদের মোকাবিলা করতে পেরেছেন, সেটা শক্তি দিয়ে হোক বা যুক্তি দিয়ে। এই দুই দিক দিয়েই সুলতান সুলেমান তাঁর বংশের অন্য শাসকদের চেয়ে অনেক শক্তিশালী ছিলেন। তিনি দীর্ঘ ৪৬ বছর রাজত্ব করেন। তাঁর শাসনামলে তিনি উল্লেখযোগ্য বহুবিধ উন্নয়নমূলক কাজ করে গেছেন। সুলেমানের শাসন আমলে অটোম্যান সাম্রাজ্যের সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির এতটা বিস্তার লাভ করে, যার ফলে এশিয়া ছাড়া ইউরোপ-আফ্রিকা বিস্তীর্ণ অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। তিনি তাঁর সন্তানদের অসম্ভব ভালোবাসতেন এবং বিপদে একে অপরের পাশে থাকার উপদেশ দিতেন। তিনি বায়তুল্লাহ, মসজিদে নববী ও মসজিদে আকসা সংস্কার করেছেন। পৃথিবী তাঁর কর্মকান্ডের ইতিহাস চর্চা করতে কখনও ভুলবে না। ইতিহাস থেকে কখনই তাঁর কর্মকান্ড মুছে ফেলর নয়। তিনি মুসলিম শাসকদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে বেঁচে থাকবেন।
লেখক : কলামিস্ট ও
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক ভোরের দর্পণ

আপনার মতামত লিখুন :