কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার! এরদোয়ানের নাকচ!!

প্রকাশিত : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১

মো. খবির উদ্দিন :
অধুনা সভ্যতার প্রতিপান্বিত পাদপীঠ আমেরিকার বিতর্কিত আবিষ্কারক ‘কলম্বাস’। ‘কলম্বাস’ ছিলেন ভ্রমণ পিপাসু। যার জন্ম ইতালির জেনোয়া শহর। অনুমান ১৪৫১ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে কোন একদিন। মৃত্যু ১৫০৬ সালে। বাবা ছিলেন কাপড়ের ব্যবসায়ী ‘তাঁতী’। কলম্বাসের ভাই লিবসন শহরে বাস করত। তিনি ২৮ বছর বয়সে ভাইয়ের কাছে চলে যান। সেখানে কাজের অবসরে গির্জায় যাতায়াত করতেন। গির্জাতেই ফোলিপা মোয়িস দ্য পেরেস্ত্রল্লো নামক তরুণীর সাথে পরিচয় হয়। পরিচয় পর্ব অল্প দিনেই অনুরাগে পরিণত হয়। তারপর বিবাহ। কলম্বাসের শ্বশুর ‘বার্তলোমিউ’ ছিলেন সম্রাট হেনরির নৌবাহিনীর এক উচ্চপদস্থ অফিসার। শ্বশুরের কাছে সমুদ্র অভিযানের গল্প শুনে তিনি অনুপ্রাণিত। তিনি ‘মার্কো পোলোর’ চীন ভ্রমণের ইতিবৃত্ত পড়ে সমুদ্র ভ্রমণের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন। ইতিহাসের বরাতে দেখা যায় ভ্রমণের সময় ‘কলম্বাস’ যে দিগনির্দেশক যন্ত্র ব্যবহার করেছেন তা ৪০০ বছর পূর্বে মুসলমান বণিকগণ ব্যবহার করেছেন। কলম্বাসের দেশ ভ্রমণের পেছনে দুটি শক্তি কাজ করেছিল। রোমাঞ্চকর অভিযানের দুরন্ত আকাক্সক্ষা, দ্বিতীয়ত স্বর্ণতৃষ্ণা। কোন কোন লেখক তাকে স্বর্ণ পিপাসু ও রক্ত পিপাসু বলতেও ছাড় দেননি। ইতিহাস তার দুঃশাসন নিয়েও আলোচনা কম করেনি। কলম্বাসই প্রথম আমেরিকা আবিষ্কার করেছেন নাকি এর আগেও কেউ। এ নিয়েও অনেক নির্ভরযোগ্য ও যৌক্তিক বিতর্ক রয়েছে।

‘কলম্বাস’ তরুণ বয়সেই ভূমধ্যসাগর এবং আটলান্টিক মহাসাগরীয় বাণিজ্যিক বন্দরগুলোতে নৌ অভিযান পরিচালনা করেন। ১৪৮৩ সালে পর্তুগালের রাজা জন দ্বিতীয়র কাছে কলম্বাস তার পরিকল্পনা জমা দেন। তাতে ছিল আটলান্টিক হয়ে পশ্চিমের দিকে ইন্ডিজে (এশিয়া) যাওয়ার পরিকল্পনা। রাজা তার পরিকল্পনায় রাজি হলেন না। পরবর্তীতে তিনি তা স্পেনের রাজা ও রানির কাছে পেশ করেন। স্পেনের রাজদরবার তার অভিযান অনুমোদন করেন। এর মধ্যে কলম্বাসের স্ত্রী ‘ফোলিপা’ অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিছুদিন পর মারা গেলেন ‘ফোলিপা’। কলম্বাসের আর কোন পিছুটান থাকল না। নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়লেন অভিযানের কাজে। অনেক ধরনা দিয়ে রানি ইসাবেলার থেকে কলম্বাসের প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান হলো। চুক্তি হলো আবিষ্কৃত দেশের শাসনভার দেয়া হবে এবং অর্জিত সম্পদের এক-দশমাংশ কলম্বাসকে দেয়া হবে। অভিযানের জন্য ৩টি জাহাজ নির্মাণ করা হলো। ১০০ টনের সান্তামারিয়া, ৫০ টনের পিন্টা, ৪০ টনের নিনা। সর্বমোট ৮৭ জন নাবিক নিয়ে তার যাত্রা। অবশেষে ১৪৯২ সালের ৩ আগস্ট কলম্বাস পাড়ি দিলেন অজানা সমুদ্রে। উপস্থিত অনেকেই ধারণা করেছিল কলম্বাস এবং নাবিকরা আর কোনদিন ফিরবে না। দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে নাবিকরা ক্লান্ত। খাবার ফুরিয়ে আসতে থাকল। নাবিকরা বিদ্রোহী হয়ে উঠল। তীরের দেখা নেই। তারা ফিরে আসতে চাইল। হঠাৎ ভাগ্যের পরিবর্তন। তীর দেখা গেল। নাবিক রোডোরিপো সর্বপ্রথম স্থলের চিহ্ন দেখতে পেলেন। কলম্বাস এশিয়ার ইন্ডিজের পরিবর্তে আমেরিকার মতান্তরে ‘বাহামাস’ দ্বীপে পৌঁছলেন। দিনটি ছিল ১৪৯২ সালের ১২ অক্টোবর। আমেরিকা মহাদেশের ঠিক কোথায় কলম্বাস তার জাহাজ থেকে নেমেছিলেন তা নিয়ে শত শত বছর ধরে বিতর্ক চলেছে। অন্তত ১০টি স্থানের বাসিন্দারা দাবি করেন যে কলম্বাস তাদের জায়গাতেই নেমেছিলেন। সেখানকার আরাওয়াক গোষ্ঠী তাদেরকে সাদরে আমন্ত্রণ জানালো। নানা রকম আপ্যায়ন করলো। কলম্বাসের ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ আরাওয়াকরা মেরামত করে দিল। স্থানীয় ইন্ডিয়ানদের এমন অমায়িক ও অতিথিপরায়ণ আচরণ দেখে কলম্বাস ভাবলেন মাত্র ৫০ জন লোক দিয়েই এদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

‘কলম্বাস’ আদিবাসীদের গায়ে অলংকার দেখে ভাবেন এখানে স্বর্ণ পাওয়া যাবে। কোথায় স্বর্ণ? খুঁজতে তিনি কয়েকজন ইন্ডিয়ানকে বন্দি বানিয়ে জাহাজে নিয়ে গেলেন। প্রথমে কিউবায় তারপর হিস্পানিওলাতে। কলম্বাস মাত্র ৩৯ জন সঙ্গীকে রেখে বাকি দুটি জাহাজ নিয়ে তিনি স্পেনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। কলম্বাস তার জাহাজে আরো কয়েকজন ইন্ডিয়ানকে বন্দি করে স্পেনে নিয়ে যান। এদিকে স্পেনে ফিরে এসে তিনি রাজা রানিকে মনোমুগ্ধকর মিথ্যে তথ্য দেন। তিনি তাদেরকে এশিয়ার চীনের একটি দ্বীপে ঘাঁটি বানিয়েছেন বলে জানান। সেখানে অনেক স্বর্ণ ও মসলা সামগ্রী রয়েছে যার জন্য তার আরো লোক প্রয়োজন। তিনি পুনরায় ১৭টি জাহাজ ও প্রায় ১২০০ লোক নিয়ে আমেরিকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। এরপর থেকে শুরু হলো আরাওয়াকদের ওপর আসল নির্মমতা।

‘কলম্বাস’ আমেরিকা ফিরে এসে দেখলেন তার রেখে যাওয়া লোকেরা নারী ও শিশুদের সাথে যৌন হয়রানির অভিযোগে স্থানীয়দের হাতে নিহত হয়েছে। এ যাত্রায় ১৪৯৫ সালে কলম্বাস তার কাক্সিক্ষত স্বর্ণের সন্ধান না পেয়ে আদিবাসীদের ক্রীতদাস বানান। কয়েকজন স্প্যানিশ ও পোষা হিংস্র কুকুর মিলে প্রায় ১৫০০ আরাওয়াক নারী, পুরুষ ও শিশুকে ধরে নিয়ে এসে একসাথে জড়ো করে। সেখান থেকে ৫০০ জনকে বাছাই করে দাস হিসেবে জাহাজে স্পেনে পাঠালে তার মধ্য থেকে পথেই প্রায় ২০০ মারা যায়।

কলম্বাসের আইনে হিস্পানিওলার একটি প্রদেশে ১৪ বছরের উপরে স্থানীয় ইন্ডিয়ানকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ তিন মাস পরপর জমা দেয়ার আদেশ জারি হয়। ব্যর্থতায় দুই হাত কেটে ফেলা হতো এবং রক্তপাতে তারা মারা যেত। তারা পালাতে চাইলে হিংস্র কুকুর লেলিয়ে তাদের ধরে এনে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে আগুনে পুড়িয়ে মারা হতো। এত নির্মমতা সইতে না পেরে আরাওয়াক গোষ্ঠীরা বিষপানে গণআত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। মায়েরা তাদের ছোট ছোট বাচ্চাদের বিষ খাইয়ে মেরে ফেলে যাতে স্প্যানিশরা তাদের বাচ্চাদের কুকুরের খাবারে পরিণত করতে না পারে। এভাবে নানা উপায়ে প্রায় ৫০ হাজার অধিবাসী আত্মহত্যা করে। খুন, অঙ্গহানি ও আত্মহত্যার কারণে মাত্র দুই বছরে হাইতির ২ লাখ ৫০ হাজারের অর্ধেক জনসংখ্যা লাশে পরিণত হয়।

ইন্ডিয়ান আদিবাসীদের সাথে অত্যাচারের তথ্য উঠে এসছে কলম্বাসের নিজস্ব জার্নাল ও বিভিন্ন চিঠির মাধ্যমে। আরো বিশদ ইতিহাস জানা যায় ‘ফাদার বার্তোলমে দে লাস কাসাস’ নামক একজন স্প্যানিশ ঐতিহাসিকের লেখা ‘হিস্টোরি অব দ্য ইন্ডিস’ এ। তিনি বেশ কয়েক বছর কলম্বাসের সাথে কাজ করেছিলেন। এমনকি কলম্বাসের ব্যক্তিগত যে জার্নাল ছিল, যেখানে কলম্বাস নিজের হাতে সব ঘটনার বর্ণনা লিখেছেন, সেই জার্নালটিও লাস কাসাসের কাছে পরবর্তীতে প্রদান করা হয়। কলম্বাস ছিলেন ফাদার বার্তোলমের আদর্শ। যখন তিনি দেখলেন কলম্বাস একটির পর একটি অপরাধ করেই যাচ্ছেন তখন তিনি কলম্বাসের সঙ্গ ছেড়ে আদিবাসীদের আসল তথ্য তুলে ধরার কাজ শুরু করলেন। তাদের ওপর হওয়া নির্মমতার চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করলেন। সেজন্য তাকে ‘ইন্ডিয়ানদের রক্ষাকারী’ বলে অভিহিত করা হয়। তার ভাষ্যমতে, স্প্যানিশরা তাদের ছুরি কিংবা তলোয়ারের ধার পরীক্ষা করার জন্য ইন্ডিয়ানদেরকে টুকরো টুকরো করে কাটত। ‘কলম্বাস’ বুঝতে পারলেন এখানে স্বর্ণ নেই তাই তিনি আরাওয়াকদের বিভিন্ন জমি দখল করে দাসে পরিণত করলেন এবং হাজার হাজার ইন্ডিয়ানকে নিষ্ঠুর পরিশ্রম করতে বাধ্য করলেন। যুদ্ধ, অত্যাচার আর রাহাজানিতে ছেয়ে গিয়েছিল আদিবাসীদের জীবন। ১৫১৫ সাল নাগাদ ৫০ হাজার ইন্ডিয়ান প্রাণে বেঁচে ছিল। ১৫৫০ সালেই সেই সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ৫০০ জনে এবং ১৬৫০ সালের হিসাব অনুসারে দ্বীপটিতে আদি আরাওয়াক গোষ্ঠীর কেউ বেঁচে রইলো না। একজন স্প্যানিশ ইতিহাসবিদের মতে, ১৫১৬ সালে যে কেউ জাহাজ নিয়ে কোনো রকম মানচিত্র অথবা কম্পাস ছাড়াই বাহামাস থেকে হিস্পানিওলা যেতে পারত। কারণ পানিতে মৃত আদিবাসীদের লাশই দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করতো।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান গত ১৫ নভেম্বর ২০১৪ শনিবার দক্ষিণ আমেরিকার মুসলিমদের এক সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, “ক্রিস্টোফার কলম্বাসের ৩০০ বছর আগেই মুসলিমরা আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার করেছিলেন। এরদোয়ান কলম্বাসের ডায়েরির কথা উল্লেখ করে বলেন, সেখানে কিউবার কোনো এক পাহাড়ে একটি মসজিদ দেখার কথা উল্লেখ আছে। ইসলামপন্থি হিসেবে পরিচিত তুর্কি প্রেসিডেন্ট বলেন, মুসলিম নাবিকেরা ১১৭৮ সালে আমেরিকায় পৌঁছান। এরদোয়ান বলেন, ইতালীয় নাবিক ও অভিযাত্রী কলম্বাস যে জায়গায় মসজিদ থাকার কথা বলেছিলেন, সেখানে তিনি একটি মসজিদ তৈরি করতে চান।

ভারতে পৌঁছানোর জলপথ আবিষ্কার করতে গিয়ে কলম্বাস ১৪৯২ সালে আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার করেন, এটি বহুজনস্বীকৃত। তবে ১৯৯৬ সালে এক বিতর্কিত লেখায় ইতিহাসবিদ ইউসেফ ম্রূয়েহ বলেন, কলম্বাসের মসজিদের উল্লেখ প্রমাণ করে মুসলিমরাই প্রথমে আমেরিকায় গিয়েছিলেন। তবে অনেক বিশেষজ্ঞই কলম্বাসের মসজিদের উল্লেখকে উপমা বলে মনে করেন। তাঁরা বলেন, সেখানে একটি পাহাড়কে মসজিদের মতো দেখতে বলে উল্লেখ করেছিলেন কলম্বাস।” (সূত্র: প্রথম আলো ১৭ নভেম্বর ২০১৪)

আমেরিকার ‘মিনেসটা ডাকোটা’ এবং ‘উইসকিনসন’ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকগণ ঘোষণা করেছেন, কলম্বাস আমেরিকার প্রকৃত আবিষ্কারক নন। এমনকি এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যেন তারা শিক্ষার্থীদের কাছে আমেরিকার আবিষ্কারক হিসেবে কলম্বাসের নাম উল্লেখ না করেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা কেন্দ্র, মিউজিয়াম এবং রাশিয়ার কিছু বিজ্ঞানিও এ অভিমত রেখেছেন যে, আমেরিকার পূর্ব অধিবাসীরা ছিল এশীয়, এমনকি তাদের সংস্কৃতি ও সভ্যতা ছিল প্রাচ্যের। এ তথ্যের স্বপক্ষে তারা জোরালো প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে রিওডি গ্রানডোর তীরে প্রাপ্ত কিছু নরকঙ্কাল। সেগুলো আরবদের গঠনের সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ। তাই ‘কলম্বাস’ যে আমেরিকায় প্রথম পা রাখেননি এটাই ঐতিহাসিক সত্য।

কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের সম্মানের ভারে চাপা পড়ে গেছে অসংখ্য নিরপরাধ নারী, পুরুষ, শিশু, ও বৃদ্ধের মৃত লাশের আর্তনাদ। চাপা পড়ে গেছে দাসে পরিণত হওয়া অসহায় মানুষগুলোর যন্ত্রণা। চাপা পড়ে গেছে সাজানো গোছানো সংসার আর স্বাভাবিক জীবনযাপন হারানোর বেদনা। ‘ক্রিস্টোফার কলম্বাস’ যে দুটি ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে জড়িয়ে আছেন সেগুলো হচ্ছে আটলান্টিক দাস বাণিজ্য ও আমেরিকায় আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের ওপর সংঘটিত গণহত্যা। একজন খুনি ও অত্যাচারী শাসক হিসেবেও তার পরিচয় আছে। আমেরিকার অধিবাসী ইন্ডিয়ান বা রেড ইন্ডিয়ানদের জীবনে এটি ছিল সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য যে, কলম্বাস ভারতে না পৌঁছে আমেরিকায় পৌঁছেছেন।

লেখক : কলামিস্ট

 

আপনার মতামত লিখুন :