চিকিৎসা সেবায় অনন্য সিএমএইচ

প্রকাশিত : ১৭ জুলাই ২০২০

যশোর, এ কে আজাদ : দেখে এলাম মৃত্যুর প্রহর গোনা মানুষগুলো। হতাশা আর কুয়াশার আঁধার। দেখে এলাম আশাহত মানুষগুলোর জীবনবোধ। উৎকণ্ঠা আর অস্থিরতার ক্ষণগুলো কাটিয়ে মানুষ কীভাবে বদলে যায়।

২১ দিন মৃত্যুর কাছাকাছি থেকে এলাম। আমি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে জীবনের নতুন ঠিকানা খুঁজে পেলাম। দেখলাম মানুষের অসহায়ত্ব, একাকীত্বতা। আচরণিক পরিবর্তন, ধর্মের প্রতি অনুরাগী হওয়া। দেখে এলাম পারিবারিক বন্ধন শৃঙ্খলা আর সংগ্রাম। আরও দেখলাম নিবেদিতপ্রাণ দুজন মানুষ। যাদের প্রেরণা মানব সভ্যতার এক মাইলফলক দৃষ্টান্ত, আর কিছু মানব-মানবী যাদের সাহচর্যে মৃত্যুপথযাত্রী মানুষগুলো দেখে আলোর ঠিকানা, খুঁজে পায় সান্ত¦না, প্রত্যাশা আর বেঁচে থাকার সাহস। মনে জাগে দৃঢ় প্রত্যয়। দেখলাম আপনজন ছাড়া নিষ্ঠুর দহনে মানুষের আত্মা কীভাবে দগ্ধ হয়, চাপা কান্নায় ফুলে উঠে বুকের পাঁজর। কত অসহায় কতটা নিঃস্ব হতে পারে মানুষ মহামারী করোনায় আক্রান্ত হলে। ভুক্তভোগীরা বুঝতে পারে এ নির্মম সত্য।

মানুষ বুঝে নিচ্ছে সে মারা যাচ্ছে। তাকে যমদূত ধরে নিয়ে যাচ্ছে। কত নিষ্ঠুর বেদনা। একজন রোগী বিদায় নিচ্ছে পরিবার থেকে। এটাই তার চিরবিদায়। মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তান মৃত্যু পথযাত্রীকে জানিয়ে দিচ্ছে গুডবাই। কেমন দেখে দেখে চলে যাওয়া, নির্মম সত্যকে স্বাগত জানিয়ে আপন আত্মার দহন ক্রিয়া সম্পন্ন করা। মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন করে প্রিয় মানুষগুলোকে ফেলে রেখে চলে যাওয়া কতটা বেদনাবিধুর কে বুঝবে সেই ক্ষণ!

যে মহৎপ্রাণ মানুষদ্বয় জীবন বাজি রেখে মৃত্যুকে তুচ্ছজ্ঞান করে মানব সেবায় নিজেদের উৎসর্গ করে চলেছেন তারা এদেশেরই গর্বিত সন্তান। একজন ডাক্তার লেফটেন্যান্ট কর্নেল সানাউল হক, অন্যজন ডাক্তার মেজর ফাতিহা।

২৩ জুন ২০২০, করোনা পরীক্ষায় পজিটিভ হয়ে আমি সিএমএইচ যশোরে ভর্তি হই। মন সায় দিচ্ছিল না আমার। ডাক্তার লেফটেন্যান্ট কর্নেল সানাউল হক আমাকে নির্ভয়ে ভর্তির পরামর্শ দেন। আমি ভর্তি হলাম সিএমএইচ ,যশোর। আমার সিটের ব্যবস্থা হল দ্বিতীয় ফ্লোরে। ওয়ার্ডভর্তি করোনা রোগী। এমনি করে চতুর্থতলা পর্যন্ত। কয়েকশত রোগী। যেন করোনা রোগীর বাজার।

যশোর ক্যান্টনমেন্ট সুরক্ষিত ও সুপরিবেষ্টিত পরিবেশে নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ভয় কী! ওই মহৎপ্রাণ মানুষ দুজন যেন ঢাল তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধে নেমেছেন। করোনা প্রতিহত করবেন, জয় করবেন মৃত্যুকে।

দিনরাত বিরামহীন যুদ্ধ, প্রাণপণ লড়াই।
কোন সৈনিককে অকালে মরতে দেবেন না, অকালে ঝরে যেতে দেবেন না। প্রতিটি রোগীকে নিয়ে তাদের নিরলস গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো, ঔষধ প্রয়োগ। এ যেন কোন ঐশ্বরিক আশীর্বাদ নিয়ে তারা মানব সেবায় ব্রত হয়েছেন। কোন ক্লান্তি নেই, অবষণœতা নেই। সেবাই যেন তাদের সাধনা, সেবাই তাদের ধর্ম।
মানুষকে আমি কখনো ফেরেশতার সাথে তুলনা করি না। মানুষ ফেরেশতা হতে যাবে কেন। মানুষ সৃষ্টির সেরা। সৃষ্টিকর্তাই মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। আর ফেরেশতা মানুষকে সেজদা করেছেন।

মানব সেবায় নিবেদিত এ মহৎ সরল প্রাণ দুটো সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পেরেছেন। ধর্ম-কর্ম কতটুকু তারা করতে পারেন তা আমার জানা নেই। কারণ আমিও অন্যান্য রোগীদের মতো তাদের সেবা গ্রহণ করেছি, নির্দিষ্ট আসনে শুয়ে থেকে। ধর্ম-কর্ম তাদের একান্তই ব্যক্তিগত। মানব সেবার চেয়ে বড় ধর্ম কী আছে তা আমার জানা নেই। ডাক্তার লেফটেন্যান্ট কর্নেল সানাউল হক ও ডাক্তার মেজর ফাতিহা মানব ধর্ম চর্চার সবগুলো স্তর শতভাগ পূর্ণ করতে পেরেছেন তাতে সন্দেহ নেই। ডাক্তার সানাউল সাহেবের বিচক্ষণতা, নেতৃত্বের গুণাবলী অসাধারণ। নিঃসন্দেহে তিনি একজন সফল অধিনায়ক। সফলতার অন্তরালে রয়েছে তার আন্তরিকতা ও ভালোবাসা। নিজ পরিবারের আপনজনের মতো তিনি সবাইকে যতেœর সাথে অতি কাছে থেকে বুঝতে চেষ্টা করেছেন। করোনা রোগী জানা সত্তে¡ও পিঠে মাথায় হাত বুলিয়ে সাহস ও সন্তুষ্টি জাগিয়ে তিনি রোগীর মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করেছেন।

ডাক্তার ফাতিহা তিনি মাতৃসুলভ আচরণ করেছেন। সেবা দিয়েছেন সবাইকে। কখনো শাসন করেছেন। রোগীদের করণীয় কাজগুলো যথাযথভাবে করার তাগিদ দিয়েছেন। মেডিকেল এসিস্ট্যান্টদের সাথে রোগীদের ব্যাপারে সর্বদা সমন্বয় করেছেন। ঔষধ প্রয়োগের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিয়েছেন। তিনি রোগীদের ব্যাপারে সর্বদা সচেতন ছিলেন। সৈনিকদের সাথে বড় বোনের মতো আচরণ করেছেন। তার ভাষাগুলো এমন যেন রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ সবাই সবার আপনজন।

নার্স, মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা সবাই মিলে একটা টিম ওয়ার্ক চালিয়ে যাচ্ছেন। সবাই নিবেদিত সবাই আন্তরিক।

সিএমএইচ, যশোর প্রকৃতপক্ষে একটি অনন্য সেবা প্রতিষ্ঠান। অন্যান্য হাসপাতালের পরিবেশ আর সিএমএইচ, যশোরের পরিবেশগত পার্থক্য তুলনা করার মতো। এখানে পরিবেশগত কারণেও ৪০ ভাগ রোগী সুস্থ হয়ে যায়।

খাদ্যের মান অপেক্ষাকৃত উৎকৃষ্ট। টিফিনসহ দিনে পাঁচবার খাদ্য পরিবেশন করে রোগীদের সেবার মান আরও উন্নত করা হয়েছে। খাদ্যে প্রোটিন, ভিটামিন ও শর্করা খাদ্যের গুণগতমান বিদ্যমান রয়েছে। সব মিলিয়ে সিএমএইচ, যশোর একটি ব্যতিক্রমধর্মী চিকিৎসালয়।

এই না হলে কী রোগীবান্ধব চিকিৎসালয়! পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কর্মীরা সদা ব্যস্ত। তাদের অবদান অপরিসীম। প্রতিটি ওয়ার্ডের ফ্লোর প্রতিদিন দুবার অ্যান্টিসেপটিক লিকুইড দিয়ে মুছে নেওয়া একজন রোগীর জন্য কতটা স্বাস্থ্যকর বুঝতে হবে। অপরিমাণ ঝুঁকি ও আন্তরিক সদিচ্ছা নিয়ে এ সকল পরিচ্ছন্ন কর্মী তাদের সেবা দিয়ে আসছে। রোগীদের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রেখে আসছে।

সিএমএইচ, যশোর চিকিৎসা সেবার এক অনন্য প্রতিষ্ঠান। ডাক্তারদের সার্বক্ষণিক তৎপরতা আর একাগ্রতা অত্যন্ত মানবীয়। প্রতিবার ঔষধ পরিবেশনের পূর্বে রোগীর অবস্থা নিয়ে তাদের একান্ত আলোচনা এক ব্যতিক্রম সেবা কৌশল। প্রতিদিন ডাক্তাররা তাদের সদিচ্ছা, আন্তরিকতা ও ভালোবাসা দিয়ে রোগীদের উজ্জীবিত করে রাখেন। বিন¤্র শ্রদ্ধা, ভক্তি আর স্নেহ দিয়ে ক্লান্ত অবষণœ হতাশাগ্রস্ত রোগীকে প্রাণবন্ত করে তোলে সতেজ করে তোলেন। তারা প্রমাণ করেছেন সেবার অপর নাম ভালোবাসা

প্রকৃতপক্ষে, প্রতিটি মহৎ কাজের পেছনে কিছু নিবেদিতপ্রাণ থাকে যাদের স্পর্শে গড়ে ওঠে বিন্দু থেকে সিন্ধু।।যারা মনের জোর দিয়ে সদিচ্ছা ও আত্মত্যাগের মহিমা দিয়ে পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য করে তোলে। ডাক্তার লেফটেন্যান্ট কর্নেল সানাউল হক ও ডাক্তার মেজর ফাতিহা সে সকল মানুষের অন্যতম উদাহরণ। পিঠে হাত বুলিয়ে ভাই-আঙ্কেল সম্বোধন করে রোগীদের সাহচর্যে এসে মনের প্রশান্তি এনে দেয়, হৃদয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করে এমন ডাক্তার দেশে কতজন আছে! লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডাক্তার সানাউল হক ও ডাক্তার মেজর ফাতিহা তাদের অন্যতম উদাহরণ।

ব্যক্তির কারণে গড়ে ওঠে সভ্যতা। ব্যক্তির নামে এলাকা হয় বিখ্যাত। সিএমএইচ, যশোর চিকিৎসা সেবার এক ব্যতিক্রম অনন্য প্রতিষ্ঠান। সেখানে করোনা রোগীর মৃত্যুর হার ১ ভাগের চেয়ে কম। তা কেবল সম্ভব হয়েছে ওখানকার দায়িত্বরত ডাক্তার-নার্সদের আন্তরিক সদিচ্ছা ও সেবাদান কৌশল। আর যারা নেতৃত্বে রয়েছেন তাদের বিচক্ষণতা ও সেবা কৌশল, তাদের মানবিক চেতনা। ঐ হাসপাতালের কমানডেন্টসহ অন্যান্য ডাক্তারদের ভ‚মিকাও স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকার মতো।

তাই বলবো আধুনিক চিকিৎসা জগতে সিএমএইচ যশোর সেবায় অনেক ধাপ এগিয়ে। যা কেবল চোখে দেখে, পরিদর্শন করেই অনুধাবন করা সম্ভব।

প্রকৃতপক্ষে যাদের সাহচর্যে আন্তরিক ইচ্ছা আর প্রচেষ্টায় সততা ও শিষ্টাচার সিক্ত হয়ে আমার মতো সাধারণ রোগীরা আনন্দ নিয়ে ঘরে ফিরেছে তারা নিঃসন্দেহে নিবেদিতপ্রাণ। ধারক ও বাহক উৎসর্গিত প্রাণ। তারা প্রকৃতির মতো সজীব, আকাশের মতো বিশাল আর সাগরের মতো গভীর। তারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তারা প্রকৃত মানুষ ডাক্তার লেফটেন্যান্ট কর্নেল সানাউল হক ও ডাক্তার মেজর ফাতিহা। জাতি তাদের কৃতিত্ব কতটা স্মরণ করবে ও মূল্যায়ন করবে জানি না। আমি তাদের স্যালুট জানাই।

সবশেষে চিরন্তন ও অনিবার্য সত্য যে, মহান আল­াহর অপার করুণা ও রহমত ছাড়া কোনো মানুষের মুক্তি সম্ভব নয়। করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ২১ দিন চিকিৎসা নেওয়ার পর এ সত্যটাই প্রমাণিত হয়েছে যে আল­াহর ক্ষমা অর্জন ছাড়া মহামারী থেকে মুক্তির কোন পথ নেই। ভালো ডাক্তারের সেবা পাওয়াও আল­াহর রহমত। যখন জীবনের মায়া ত্যাগ করে অশ্রæসজল চোখে সবার কাছ থেকে বিদায় নিলাম, তখন বুকে ধারণ করে নিলাম দুটি পবিত্র শব্দ, ‘আল­াহু আকবর ও লা ইলাহা ইল­াল­াহ’। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সঙ্গী করে নিলাম তাহাজ্জুদ নামাজসহ ৫ ওয়াক্ত নামাজ।

আল­াহ মহান। তিনি রহম করেছেন। অতঃপর পেয়ে গেলাম মহামারী থেকে মুক্তির জন্য দুটি অব্যর্থ মহাঔষধ। ১. আল­াহু আকবার ২. লা ইলাহা ইল­াল­াহ। আর ভ্যাকসিন হিসেবে পেয়ে গেলাম, ‘নামাজ’। আল­াহ সবাইকে হেফাজত করুন।

লেখক : কথা সাহিত্যিক, কবি ও নাট্যকার এ কে আজাদ।

আপনার মতামত লিখুন :