করোনায় দীর্ঘশ্বাসের মধ্যেই আশায় বুক বেঁধেছেন মুমিনুল

প্রকাশিত : ১৬ এপ্রিল ২০২০

করোনাভাইরাসের কারণ বিশ্বের প্রায় সব কর্মকাণ্ড স্থবির। স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালতে কর্মব্যস্ততা নেই। সবাই বাইরের কাজকর্ম ছেড়ে গৃহবন্দী। শুধু কর্মজীবন কেন, থেমে গেছে জীবনের প্রাণচাঞ্চল্য। একের পর এক স্থগিত হয়ে যাচ্ছে নানা দেশের ক্রীড়া সূচি। এই তো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করা হলো ভারতের সাড়া জাগানো টি-টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজি আসর আইপিএল।

বাংলাদেশেরও একটি হোম সিরিজ আর দুটি বিদেশ সফর সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এপ্রিলের প্রথম ভাগে পাকিস্তানের করাচিতে একটি একদিনের ম্যাচ ও টেস্ট খেলতে যাওয়ার কথা ছিল, সেটি হয়নি। মে মাসে আয়ারল্যান্ড-ইংল্যান্ডে ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি সিরিজও খেলতে যাওয়া হবে না। জুনে অস্ট্রেলিয়ার দুটি টেস্ট খেলতে আসার কথা ছিল। দুই বোর্ডের সম্মতিতে সেটাও বন্ধ করা হয়েছে।

এখন এ বছর একটিই হোম সিরিজ শুধু বাকি, সেটা নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। আগামী আগস্টে বাংলাদেশের মাটিতে টাইগারদের সঙ্গে দুই টেস্ট খেলার কথা আছে ব্ল্যাকক্যাপসদের। এখন এই সিরিজ হবে কি না, সেটাই দেখার।

এখনকার অবস্থা থাকলে বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড টেস্ট সিরিজ হওয়ার প্রশ্নই আসে না। করোনার ভয়াবহতা কমে আসলে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই কেবল ঐ সিরিজ হতে পারে। বুধবার রাতে আলাপে এমন পূর্বাভাসই দিয়েছেন বিসিবি সিইও নিজামউদ্দীন চৌধুরী সুজন।

খেলা হলে সবাই মাঠে যাবেন। আবার বাংলাদেশের মাটিতে টেস্ট হবে। একটা অন্যরকম পরিবেশ-পরিস্থিতির উদ্ভব হবে। ক্রিকেটার, কোচিং স্টাফ, বোর্ড কর্তা, মিডিয়া, বাংলাদেশের ভক্ত-সমর্থক সবাই সেই আশায় বুক বেঁধে আছেন।

ক্রিকেটারদেরও আশা কম নয়। তারাও আবার মাঠে ফিরতে উন্মুখ হয়ে আছেন। তবে অন্য যে কারোর চেয়ে টেস্ট দলের অধিনায়ক মুমিনুল হকের উৎসাহ আকাঙ্ক্ষাটা একটু বেশি। মুমিনুল আশায় আছেন নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে টেস্ট সিরিজটি যেন হয়। ভাবছেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণ থামলে ক্রিকেট মাঠে গড়াবে, সে আশায় উন্মুখ সবাই। নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে টেস্ট নিয়ে মুমিনুলের উৎসাহ বেশি কেন?

যেহেতু মুমিনুল এখন শুধুই টেস্ট খেলেন। হাতে গোনা দুই-তিন জনের একজন যিনি টেস্ট স্পেশালিস্ট। ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি কোন ফরম্যাটেই এখন আর মূল দলে নেই। তাই তার টেস্ট খেলার ইচ্ছে ও সংকল্প বেশি। তামিম, মুশফিক, লিটনসহ আরও ৮-১০ জন ক্রিকেটার টেস্টের পাশাপাশি ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টিও খেলেন। তাই তাদের শুধু টেস্ট সিরিজ বা ম্যাচের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না। আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ মেলে প্রচুর।

মুমিনুলের সে সুযোগটা নেই। তাকে অপেক্ষায় থাকতে হয় কবে কখন টেস্ট ম্যাচ বা সিরিজ হবে সেই দিকে। স্বাভাবিকভাবেই টেস্ট ম্যাচ ও সিরিজ নিয়ে তার উৎসাহ-আগ্রহ একটু বেশি থাকারই কথা। আর একটি টেস্ট সিরিজ বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে এক বছর থেকে তার একটি সিরিজ কমে যাওয়া।

‘আমি যেহেতু শুধু টেস্ট খেলি, তাই টেস্ট ম্যাচ বা সিরিজ খেলতে মুখিয়ে থাকি’- স্বল্পভাষী মুমিনুল এ কথা কখনও মুখ ফুটে বলেননি। তবে ভেতরের ভাবটা এমনই থাকে বর্তমানে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ঘরে আবদ্ধ মুমিনুলের। ফিটনেস ট্রেনিং করে আর পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মুঠোফোন আলাপেই কাটছে সময়।

এর বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে সৌজন্যতা ও কুশল বিনিময়ের পরই টেস্ট সিরিজের প্রসঙ্গ তোলেন মুমিনুল।  সোমবার নববর্ষের দিন কথা বলতে গিয়েও নিউজিল্যান্ড সিরিজ নিয়ে যেচে জানতে চাইলেন, ‘নিউজিল্যান্ড সিরিজের কী অবস্থা জানেন? এমন অবস্থা থাকলে তো প্রশ্নই আসে না, আল্লাহর রহমতে যদি করোনাভাইরাস সংক্রমণ কমেও যায়, তখন কি টেস্ট সিরিজ হবে?’

জুনে অস্ট্রেলিয়ার আসার কথা ছিল দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলতে। সে সিরিজ নিয়েও ভেতরে ভেতরে অনেক আশা ছিল মুমিনুলের। কিছু পরিকল্পনাও মাথায় ছিল। তিনি বলেছেন, ‘অসিরা আগেরবার এক ম্যাচ হেরে গেছে। এবার খুব ভেবেচিন্তে, হিসেব কষে এবং ভালোমতো প্রস্তুতি নিয়েই টেস্ট খেলার ভাবনা ছিল। শেষপর্যন্ত অসিরা না আসায় খারাপ লাগছে।’

এখন মুমিনুল আশায় আছেন নিউজিল্যান্ড সিরিজ যেন হয়। তবে সেটা অবশ্যই জোর করে নয়। করোনার ভয়াবহতা ও বিস্তৃতি সম্পর্কে ভালই খোঁজখবর রাখেন তিনি। জানেন করোনা ছড়িয়ে পড়েছে আনাচে কানাচে। তারপরও আশায় আছেন, সৃষ্টিকর্তার দয়া ও কৃপায়- এ সংকট কাটতেও পারে। করোনা নামক বিপদের হাত থেকে মানুষ নিষ্কৃতি পেতে পারে। মনের গহীনে আছে কিছু স্বপ্ন। প্রত্যাশার জালও বুনছেন মুমিনুল।

টেস্ট অধিনায়কত্বের শুরুতে নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি কক্সবাজারের এ বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। ভারতের সঙ্গে দুই টেস্টের সিরিজে চরম ব্যর্থতা ছিল সঙ্গী। এর মধ্যে কলকাতায় উভয় ইনিংসে করেছেন শূন্য। পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের সঙ্গে এক টেস্টেও (৩০, ৪১) বড় ইনিংস নেই।

তবে শেষ সিরিজে এসে নিজেকে খুঁজে পাওয়া। অবশেষে জ্বলে উঠেছে ব্যাটসম্যান ও অধিনায়ক মুমিনুলের ব্যাট। জিম্বাবুইয়ানদের সঙ্গে সামনে থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই তো চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে মিরপুরের শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের সঙ্গে শেষ টেস্টে অনবদ্য সেঞ্চুরি (২৩৪ বলে ১৩২) করেছেন।

তার সহযোগী ক্রিকেটারদের বেশিরভাগই ২০২০ সালে ৩ ওয়ানডে আর ৪ টি-টোয়েন্টি খেলে ফেলেছেন। সেখানে মুমিনুলের ঐ ফেব্রুয়ারিতে জিম্বাবুয়ের সঙ্গে টেস্ট ম্যাচটিই শেষ। তাই শেষপর্যন্ত বাংলাদেশ আর নিউজিল্যান্ড সিরিজ যদি আগষ্টে না হয়, তাহলে হয়তো ২০২০ সালে মুমিনুলের আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা নাও হতে পারে। তাই করোনায় আর সব কিছুর মত ক্রিকেট বন্ধে মুমিনুল হকের দীর্ঘশ্বাসটা একটু বেশিই লম্বা।

আপনার মতামত লিখুন :