বিআরটিসি বাস চলাচলে তুঘলকি কান্ড জরিমানা,মাসোয়ারা গুনেই চলছে বাস ডিপোর চালকরা

প্রকাশিত : ২৩ জানুয়ারি ২০২৩

এস এম বাবুল

রাজধানী থেকে বিভিন্ন রুটে বিআরটিসি বাস চলাচল নিয়ে চলছে তুঘলকি কান্ডকারখানা।ডিপোর ম্যানেজাররাই থাকেন এসবের নেপথ্যে। বিআরটিসি বাসচালকরা ম্যানেজারদের চরম নিষ্পেষণের শিকার হন। যা বলার মতো জায়গাও তারা খুঁজে পান না। সাহস করে বললেও বিচারের পরিবর্তে উল্টা নিগৃহীত হন।
গাজীপুর-মতিঝিল রুটে মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ ট্রিপ না হলেই জরিমানা ও কুড়িল-গাউছিয়া রুটে গাড়ী চালালে দিতে হয় মাসোয়ারা। কেউ এর প্রতিবাদ করলে তাকে হয়রানি সহ বদলীর হুমকি দেওয়া হয়। গাজীপুর বাস ডিপোর ম্যানেজার কামরুজ্জামানের এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিআরটিসি’র চেয়ারম্যানের কাছে বিচার চেয়ে ও প্রতিকার না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ওই ডিপোর চালকরা।

চালকেরা জানান, গাজীপুর বাস ডিপোর ম্যানেজার কামরুজ্জামান ডিপোতে যোগদানের পর থেকে গাজীপুর-মতিঝিল রুটে চলাচলকারি দ্বিতল বাসে ট্রিপ নির্ধারণ করে দেন। মাসে বিশ ট্রিপের কম হলে প্রতি ট্রিপের জন্য জরিমানা বেতন থেকে কর্তন করেন। চালকরা এর প্রতিবাদ করলে তাদেরকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বদলীর ভয় দেখান।

চালকদের অভিযোগ, গাজীপুর-মতিঝিল রুটে অন্যান্য ডিপোর বাস ও চলাচল করে। ওই সকল বাস টঙ্গীর কলেজগেট পর্যন্ত যাওয়ার কথা থাকলেও তারা গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত চলাচল করে। এতে আমাদের যাত্রী কমে যায়। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর গাজীপুরের যাত্রী পাওয়া যায় না। যাত্রী স্বল্পতার কারণে আমরা দুইট্রিপ দিতে পারিনা। যেহেতু ট্রিপপ্রতি সেল নির্ধারণ করা সেহেতু যাত্রী না থাকলে আমাদের পকেট থেকে সেলের টাকা জমা দিতে হয়। তাছাড়া তীব্র যানজটে গাজীপুর থেকে মতিঝিল যেতে চার ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায়। আবার কখনো কখনো সকালে রওনা দিয়ে দুপুরের আগে মতিঝিল পৌঁছাতে পারি না। দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর আবার গাজীপুর অভিমুখে রওনা দিয়ে যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। তখন আর ঢাকামুখী যাত্রী পাওয়া যায় না। আর তখন ট্রিপ দিলেও দুই ট্রিপের সেলের টাকা আয় করা সম্ভব হয় না।

এ রুটে কর্পোরেশনের নির্দিষ্ট কন্ডাক্টর না থাকায় বাইরের লোক দিয়ে ভাড়া কাটতে হয়। তাদের পারিশ্রমিক ও সারাদিনের খরচ বাদ দিয়ে যে টাকা থাকে তা দিয়ে অনেক সময় সেল জমার টাকা হয়না। যার কারণে আমরা ট্রিপ বাড়াতে পারিনা। একদিন পর পর ডিউটি থাকায় মাসে পনের দিনে পনের ট্রিপ কোন কোন মাসে বেশি ও হয়। তবে বিশ ট্রিপের কম হলেই গুনতে হয় জরিমানা। মাস শেষে কম ট্রিপের অজুহাতে সাত থেকে আট হাজার টাকা কর্তন করে ম্যানেজার কামরুজ্জামান।

দিনে দুই ট্রিপ দেওয়ার জন্য চালকেরা ম্যানেজারের কাছে বিআরটিসি’র কন্ডাক্টর চেয়ে এবং অন্য ডিপোর বাস যাতে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত চলাচল না করে তার দাবি জানালেও কার্যকর কোন ব্যবস্থা নেননি ডিপোর ম্যানেজার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চালক বলেন, আমরা ম্যানেজারকে আমাদের সমস্যার কথা বারবার বলার পরও তিনি কোন ব্যবস্থা না নিয়ে ট্রিপ কমের অজুহাতে বেতন থেকে টাকা কর্তন করেন প্রতি মাসে। এতে আমাদের সংসার চালাতে খুব কষ্ট হয়। আমরা তো বাইরের স্টাফ না। বিআরটিসি’র নিয়মিত স্টাফ হয়েও কম ট্রিপের অজুহাতে কেন আমাদের বেতন কর্তন করা হয় এমন প্রশ্ন চালকদের।

আরেক চালক পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এ প্রতিবেদককে জানান, গাজীপুর বাস ডিপোর নিয়ন্ত্রণে কুড়িল (বিশ্বরোড) থেকে গাউছিয়া রুটে আর্টিকুলেটেডের (জোড়া বাস) বিশ থেকে পঁচিশ টি বাস নিয়মিত চলাচল করে। এই বাসগুলো লীজ পার্টি দিয়ে পরিচালিত হয়। এ রুটে গাড়ী চালালে ম্যানেজারকে প্রতিমাসে দিতে হয় তিন থেকে চার হাজার টাকা। কেউ এই টাকা দিতে না চাইলে তাকে এ রুট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আর এক চালক ভোরের দর্পণকে বলেন, ম্যানেজারের ব্যক্তিগত চালক হুমায়ুনকে দিয়ে এই টাকা তোলা হয়। কেউ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে উপরের মহলের ভয় দেখানো হয়।

নিজ নামে গাড়ী পরিচালনা না করতে এর আগেও চালকরা গণস্বাক্ষরে চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন জানিয়েছিল। আবেদনে চালকরা স্থায়ী কন্ডাক্টর না থাকায় রাজস্বের পরিমাণ কমের কথা উল্লেখ করলেও আজো ওই রুটে স্থায়ী কন্ডাক্টর দেওয়া হয়নি। তাছাড়া নিজ নামে রাজস্ব আয়ের টেনশন মাথায় নিয়ে গাড়ী চালালে দুর্ঘটনার সম্ভবনার কথা জানালেও কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোন ব্যবস্থা নেননি। উপরন্ত দুশ্চিন্তা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে ট্রিপের পরিমাণ নির্ধারণ ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে।

অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ম্যানেজার কামরুজ্জামানের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। এছাড়া ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও তার কোন জবাব পাওয়া যায়নি।

আপনার মতামত লিখুন :