শ্রীপুরের দুটি গণকবর আজও মুক্তিযুদ্ধের নির্মমতার সাক্ষী

প্রকাশিত : ১৩ ডিসেম্বর ২০২০

এমদাদুল হক, শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধিঃ

সারাদেশের মতো গাজীপুরের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হতে হয়েছে। যুদ্ধের শুরু থেকে স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত এদেশের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে পাস্তিানীরা। শ্রীপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্থাপিত পাক বাহিনীর ক্যাম্পে স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় এনে মুক্তিকামী মানুষদের নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করত, নারীরাও বাদ যেত না এ থেকে। পরে শহীদ মৃতদেহের ঠাঁই হতো শ্রীপুর মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী সরকারি কলেজ মাঠের পাশে।

পাক হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের নির্মম সাক্ষী শ্রীপুর মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী সরকারি কলেজ ও শ্রীপুরের বরমী ইউনিয়নের সাতখামাইর এলাকার গণকবর। মুক্তিযুদ্ধের পর এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময় নানা ধরণের সংষ্কারের মাধ্যমে গণকবরগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে জানা গেছে, কেওয়া আকন্দবাড়ী গ্রামের শহীদ আলমগীর বাদশা আকন্দের ছেলে নজরুল ইসলাম আকন্দ মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। স্থানীয় রাজাকারদের মধ্যে এ খবর ছড়িয়ে পড়লে তাদের সহায়তায় পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধার বাবা আলমগীর বাদশা আকন্দকে এলাকা থেকে ধরে শ্রীপুরের পাক বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে আসে। সেখানে নির্যাতন চালিয়ে হত্যার পর শ্রীপুর মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী সরকারি কলেজ মাঠের পাশে গণকবর দেয়। একইভাবে শ্রীপুরের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য সংগ্রহের জন্য শ্রীপুর ক্যাম্পে ধরে এনে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয় শ্রীপুর পৌরসভার উজিলাব গ্রামের ওমর আলী প্রধান, আব্দুস সামাদ, লিয়াকত আলী মিয়া, কেওয়া গ্রামের আব্দুস সাত্তার ভাঙ্গী, একই গ্রামের আব্দুল খালেক পালোয়ান, ভাংনাহাটি গ্রামের শুক্কুর আলী, বরমী ইউনিয়নের সাতখামাইর গ্রামের আব্দুল লতিফ, আব্দুস সাত্তার, সালেহা বেগম ও শিরিন আক্তারকে। তাদের প্রত্যেকের মরদেহ শ্রীপুর মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী সরকারি কলেজের গণকবরে সমাহিত করা হয়। এখানে ১২ জন শহীদের গণকবর রয়েছে।

১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের দিকে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে নিয়ে সাতখামাইর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা রহিমউদ্দিন আকন্দ ঢাকা-ময়মনসিংহ রেল সড়কের সাতখামাইর এলাকার রেললাইনের একটি পিলার উঁড়িয়ে দেন। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ পাকবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। ঘটনার তিনদিনের মধ্যেই স্থানীয় রাজাকার নওয়াব আলীর দিক নির্দেশনায় রাতের বেলা ট্রেনে করে আসেন পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা। রাজাকারদের সহযোগিতায় সাতখামাইর গ্রামে ঢোকেন। তারা শুক্কুর আলীর ছেলে আতর আলী ও তার বাড়িতে বেড়াতে আসা ইউসুফ আলীকে আতর আলীর ঘরের পাশেই কাপড় দিয়ে বেঁধে দাঁড় করান। এসময় আশপাশের বাড়ি থেকে ধরে আনা হয় সাতখামাইর রেল ষ্টেশনের গেটম্যানের ছেলে মনির, এলাকারই ছনা পাগলা ও কান্দু মুন্সীকে। সবাইকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করা হয়। তাদেরকে আতর আলীর পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। আর মনিরের নববিবাহিত স্ত্রী সালেহা বেগমকে ধরে নিয়ে যায় শ্রীপুর ক্যাম্পে। সেখানে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে সালেহাকে হত্যার পর শ্রীপুর মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী সরকারি কলেজ মাঠের পাশে গণকবরে সমাহিত করা হয়।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কেওয়া আকন্দবাড়ী গ্রামের শহীদ সাদির আকন্দের ছেলে পীরে কামেল শাহ সুফী মাওলানা মো. নূরুজ্জামান আকন্দ জানান, ১৯৬৫ সালে তার বাবা মৌলভী মো. সাদির আকন্দ বৃটিশ সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহন করেন। পরে তিনি টঙ্গীতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করেন। এদিকে তরুন যুবকদের প্রশিক্ষিত করে তোলার ভয়ে পাকিস্তানী সেনা সদস্যরা তখন অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যেদের খোঁজে বের করে হত্যাযজ্ঞ চালাতে শুরু করে। ১৯৭১ সনের ৩ এপ্রিল টঙ্গী অলিম্পিয়া টেক্সটাইল মিলের সামনে ফজরের নামাজ শেষে তার বাবা বাসায় ফিরছিলেন। তখন দেশে কারফিউ চলছিল। ওই অবস্থায় তার বাবা পাক সেনাদের কাছে মানুষ হত্যার প্রতিবাদ করেছিলেন। কথোপকথনে অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য হিসেবে তার পরিচয় পাওয়ার পর সাতটি বুলেটের আঘাতে পাকিস্তানী সেনারা নির্মমভাবে তাকে হত্যা করে। তার লাশটিও রেখে যায়নি হানাদাররা।

শ্রীপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার সিরাজুল হক বলেন, রাজাকারদের সহযোগিতা ও হানাদারদের নৃ-শংসতায় যারা শহিদ হয়েছিল তাদেরকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের প্রয়োজন। এভাবে সারা দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলাসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের বধ্যভূমিগুলোকে চিহ্নিত করে সেগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি।

 

আপনার মতামত লিখুন :