ঘরে অসুস্থ স্বামী; ভাংগা পা নিয়ে নৌকা বাইছে ষাটোর্ধো শাহিনুর

প্রকাশিত : ১৪ অক্টোবর ২০২০

এস এম বাবুল:

রাজধানীর মেরুল বাড্ডার আলিফনগর ও আফতাবনগর গোদারাঘাটে নৌকা বেঁয়ে সংসার ও অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা চালিয়ে আসছিলেন ষাটোর্ধো শাহিনুর বেগম। স্বামী গফুর মিয়া দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। স্বামীর চিকিৎসা ও সংসারের হাল ধরতে শাহিনুর বেগম বছর ছয়েক আগে হাতে তুলে নিয়েছিলেন লগি-বৈঠা। সারাদিন এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত নৌকা ঠেলে যা উপার্জন করেছেন তার সিংহভাগই ব্যয় করেছেন অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসায় বাকি অর্থে কোনো রকম চলছে এ বৃদ্ধার সংসার। স্ত্রী ও চার সন্তানকে নিয়ে আব্দুল গফুর মিয়া গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া ছেড়ে পাড়ি জমান রাজধানীতে।

স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে ভালোই চলছিল গফুরের সংসার। বছর ছয়েক আগে গফুর মিয়া অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং এরই মধ্যে ছেলে-মেয়েরা বিয়ে করে যার যার সংসার নিয়ে বিছিন্ন হয়ে যায়। অসুস্থ বৃদ্ধ গফুর মিয়াকে দেখার কেউ না থাকায় স্ত্রী শাহীনুর বেগম নৌকা চালিয়ে সংসারের হাল ধরেন। ধার দেনা ও ঋন করে চৌদ্দ হাজার টাকা দিয়ে নৌকা কিনে শুরু করেন জীবন যুদ্ধের লড়াই। ধীরে ধীরে ঋনের টাকা পরিশোধের পাশাপাশি সংসার ও অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন অদম্য এ নারী। হাড়ভাংগা পরিশ্রমের মাঝেও অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে খেয়ে পরে কোনো রকম বেঁচে ছিলেন এ বৃদ্ধ দম্পতি।

মাস তিনেক আগে নৌকা থেকে পড়ে পাঁ ভেংগে সকল আশা নিরাশায় পরিণত হয় শাহিনুরের। কিছুদিন আগে আলিফনগর-আফতাবনগর গোদারাঘাটে কথা হয় শাহিনুরের সাথে। মুখে ক্লান্তির ছাপ রুদ্রকন্ঠে বৈঠা ঠেলে চলছেন ভাংগা পাঁ নিয়ে এ বয়স্ক নারী। ভরদুপুর রোদের তীব্রতা বেশ। শরীর থেকে ঘাম ঝরছে কাপড়ের আচল দিয়ে তা মুছে ক্লান্তি দূর করার চেষ্টা করছেন নৌকার মাঝি বৃদ্ধা শাহিনুর। শরীরের ঘাম মুছলেও মুছতে পারিনি মুখের ক্লান্তির ছাপ।

 

নৌকা চালিয়ে দৈনিক আয়ের কথা জানতে চাইলে ভোরের দর্পণকে এ মাঝি জানান, গরীবদের পারাপারই এ ঘাটে বেশী। ঠিকমতো এরা টাকা দিতে পারেনা। সারাদিন দুইশ টাকার মতো আয় হয়। এ টাকা দিয়ে ঘরভাড়া, বাজার ও ওষুধ সহ সংসারের খরচ চালিয়ে কোনো রকম খেয়ে পরে বেঁচে আছেন বলে জানালেন। ভাংগা পাঁ নিয়ে এ বয়সে নৌকা চালাচ্ছেন প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নে ষাটর্ধ্বো শাহীনুর বেগমের অশ্রসিক্ত জবাব, গরীবের আবার বয়স! যতদিন বেঁচে থাকি ততদিন কাজ করে খেতে হবে। কাজ করতে না পারলে খাবার দেবে কে, অসুস্থ স্বামীকে দেখবে কে, এভাবে বিড়বিড় করে কথা বলে যাচ্ছেন ষাটধ্বো এ বৃদ্ধা। রোদ, বৃষ্টিতেও থেমে থাকেনি শাহিনুরের নৌকা।

 

গত সোমবার মুঠোফোনে কথা হয় বৃদ্ধা শাহিনুরের সাথে, কান্না ভেজা কন্ঠে তিনি প্রতিবেদককে জানান প্রায় সপ্তাহ খানেক ধরে তিনি ভাংগা পাঁ নিয়ে চলাফেরা করতে পারছেন না। চলছে না তাঁর নৌকা। অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে অর্ধাহারে অনাহারে বিনা চিকিৎসায় চলছে শাহিনুরের সংসার। সরকারী কোনো সাহায্য পান নি জবাবে গোদারাঘাটের এ মাঝি বলেন, এ এলাকার ভোটার ছাড়া সাহায্য দেওয়া হয় না। মরে গেলেও কেউ সাহায্য দেয় না। অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন খেয়াপারের এ মাঝি। জীবনের সাথে হার না মানা শাহিনুর আজ বড় অসহায়।

বৃদ্ধা শাহিনুরের আকুতি অসুস্থ স্বামী ও তাঁর চিকিৎসায় সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতায় সুস্থ হয়ে আবার জীবন সংগ্রামে জয়ী হতে চাঁন গোদারাঘাট খেয়াপারের বৃদ্ধা এ মাঝি।

 

আপনার মতামত লিখুন :