পানির অভাবে তিস্তা এখন ধূ-ধূ বালুচর

প্রকাশিত : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১

লালমনিরহাট প্রতিনিধি :

ধূ-ধূ বালুচরে পরিণত হয়েছে তিস্তা। দেশের বৃহত্তম তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের ব্যারাজটি বর্তমানে দাঁড়িয়ে আছে বালু চরে। বড় বড় বালুর স্তুপ পরে মূল নদীর গতিপথ হারিয়ে যেতে বসেছে। নদীতে পানি না থাকায় ভাটিতে প্রায় ১৩০ কিলোমিটারজুড়ে পানির অভাবে খাঁ খাঁ করছে। নদীতে কোন স্রোত নেই। নৌকা চলাচলও নেই।

 

গত বছরের জুলাই মাসে টানা বৃষ্টি আর উজানের ঢলে ভয়ংকর আকার ধারণ করে তিস্তা নদী। বর্ষা মৌসুমে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প ‘তিস্তা ব্যারাজ’ রক্ষায় খুলে দেয়া হয় ৫২ টি গেট। এতে শুধু ব্যারাজের উজানের বাসিন্দারাই নন ভাটিতে থাকাও লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। নদী ভাঙনে বসত-ভিটাসহ সবকিছু হারিয়ে নি:স্ব হয়ে পরেন কয়েক লক্ষাধিক পরিবার। পরিবারগুলো বাঁধে রাস্তায় কেউবা অন্য জমিতে আশ্রায় নিয়ে আছেন। অথচ মাত্র ৩ মাসের ব্যবধানে সেই তিস্তা নদী এখন ধূ-ধূ বালুচরে পরিণত হয়েছে।

জানা গেছে, ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর নীলফামারী জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ভারতীয় সীমান্ত ঘেসে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এই তিস্তা নদী। নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী বন্দর হয়ে মিলিত হয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদে।

 

৩১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীর বাংলাদেশ অংশে রয়েছে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার। গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে ভারত সরকার একতরফা তিস্তার পানি নিয়ন্ত্রণ করায় প্রতি বছর বর্ষা শেষ হতে না হতেই বাংলাদেশ অংশে মরা খালে পরিণত হয় তিস্তা। তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় একদিকে যেমন বর্ষা মৌসুমে ভারত থেকে নেমে আসা ঢলে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ নি:শ্ব হচ্ছে।

তেমনি শুস্ক মৌসুমেও তিস্তা ব্যারাজের ভাটিতে ভারত তাদের গোজল ডোবা নামে বাঁধের সাহায্যে একতরফাভাবে পানি আটকিয়ে বাংলাদেশের উত্তর জনপদের লাখ লাখ কৃষকের বোরা চাষাবাদ ব্যাহত করছে। ফলে দিনে দিনে প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে দেশের বৃহত্তম তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পটি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রতিবছর শুস্ক মৌসুমে যে হারে পানি প্রবাহ কমে আসছে তাতে করে শীঘ্রই কাংখিত পানি চুক্ত সম্পন্ন না হলে, মরা খালে পরিণত হতে পারে বহুল আলোচিত তিস্তা নদী। আর সেই সাথে তিস্তা নদীর সাথে জড়িয়ে থাকা উত্তর জনপদের জীব বৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে বলে আশংকা করা হচ্ছে।

এদিকে আগামী ২৬ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকা সফরের সূচি চূড়ান্ত হওয়ায় খুশি তিস্তাপারের কোটি মানুষ। তিস্তার পানি চুক্তি নিয়ে আশার আলো দেখছেন তিস্তা পাড়ের মানুষ।

সরেজমিন দেখা গেছে, তিস্তার মুল নদীতে বড় বড় বালুর স্তুপ। নদীতে কোন পানি নেই। চোখ জুড়ে শুধুই বালু চর। তিস্তা ব্যারাজের মোট ৫২ টি গেটের মধ্যে ৪৫ টি বন্ধ করে উজানের পানি আটকানোর চেষ্ঠা করছেন কর্তৃপক্ষ। এতে করে যেটুকু পানি উজানে জমছে তাতেই ব্যারাজটির বাকি ৭ টি গেটের মাধ্য ইরি ধানের জন্য সেচ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

তিস্তা পাড়ের দোয়ানী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মালেক জানান, এই তিস্তা নদী আমাদের কোন উপকারে আসে না। শুধু প্রতিবছর ভাঙনে আর পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হই। আমাদের লালমনিরহাট জেলা তিস্তা নদী হলেও তার সুবিধা নেয় নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুরে মানুষ।

তিস্তা পাড়ের জেলে হযরত আলী (৪৫) বলেন, তিস্তায় পানি নেই। জোয়ারে যে পানি আসে সেই পানি দিয়ে ইরি ধান চাষ হয়। বর্তমানে নদীতে পানি না থাকায় জাল গাথি খাই। দুই দেশের সরকার যদি যোগাযোগ করে তিস্তায় পানি দেয় তাহলে হাজার হাজার জেলে বাঁচবে সরকারের কাছে এটাই অনুরোধ জানাই।

কালীগঞ্জ উপজেলার চর বৈরাতী গ্রামের কৃষক আফজাল হোসেন (৫০) জানান, তিস্তায় পানি না থাকায় ভুট্টা ও কুমড়া ক্ষেতে সেচ দিতে পারছি না। তাই ক্ষেতে সেচ দিতে শ্যালোমেশিন বসিয়ে সেচ দিচ্ছি। এভাবে সেচ দিতে প্রচুর টাকা খরচ হচ্ছে। নদীতে পানি থাকলে এটা এতো খরচ হত না।

তিস্তা ব্যারাজ ডালিয়া পয়েন্টের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানিয়েছেন, তিস্তা নদীর উজানে বর্তমানে ২ হাজার ৫ শত কিউসেক পানি নদীতে আছে। তা দিয়ে সেচকার্যক্রম স্বাভাবিক থাকবে। তিনি আরও বলেন, তিস্তা নদীর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজন কমপক্ষে ৪ হাজার কিউসেক পানি। কিন্তু ডিসেম্বর মাসের পর থেকে তিস্তায় পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়।

 

আপনার মতামত লিখুন :