ধরলা ও ব্রহ্মপুত্রের বুকে ভাসছে তারা

প্রকাশিত : ৪ সেপ্টেম্বর ২০২১

কুড়িগ্রামের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ধরলার পানি সেতু পয়েন্টে বিপৎসীমার ৬২ সেন্টিমিটার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপৎসীমার ৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে এই দুই নদ-নদীর অববাহিকার দুই শতাধিক চরাঞ্চলের লক্ষাধিকেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি জীবন যাপন করছে।

এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার অববাহিকায় জেগে ওঠা নতুন চরে বসত গড়া মানুষজন। ১৫ দিনেরও বেশি সময় ধরে এসব চরের মানুষ পানিবন্দি জীবন যাপন করায় দেখা দিয়েছে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য ও গোখাদ্যের সংকট। দীর্ঘ সময় পানিতে অবস্থান করায় হাতে-পায়ে ঘাসহ অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছে পানিবাহিত রোগে।

সরেজমিনে কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের দক্ষিণ বালাডোবার চরে দেখা যায়, প্রায় শতাধিক পরিবারের বাড়িঘরের অর্ধেক পানিতে তলিয়ে আছে। ১০ থেকে ১২টি পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মীয়ের বাড়ি ও উঁচু জায়গায় স্থান নিলেও বাকি পরিবারগুলো নৌকায় ও ঘরের ভেতর উঁচু করা মাচানে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েসহ পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করছে।

সেখানে নৌকা দেখে ত্রাণের আশায় ছুটে আশা মানুষজন জানান, প্রায় ১৫ দিনেরও বেশি সময় ধরে এই চরের মানুষ পানিবন্দি হয়ে কষ্টে দিন যাপন করলেও এখন পর্যন্ত সবার বেশির ভাগ পরিবার সরকারি বা বেসরকারি খাদ্যসহায়তা পায়নি। হাতে কাজ না থাকায় খাদ্যসংকটে পড়েছেন এসব চরের শ্রমজীবীরা।

উলিপুরের বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের দক্ষিণ বালাডোবার চরের বন্যাকবলিত রহিমা বেগম জানান, এবারের বন্যার পানিতে তার ঘরের অর্ধেক তলিয়ে গেছে। বাড়ির পাশে বড় নৌকা আসতে দেখেই শিশুসন্তানকে কোলে নিয়ে একবুক পানি মাড়িয়ে নৌকার কাছে ছুটে এসেছেন তিনি।

সরকারি কোনো সহায়তা পেয়েছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো সহায়তা পাইনি। ঠিকমতো রান্না করতে পারছি না। খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছি।

রহিমা বেগমের মতোই একে একে শিশু সন্তানদের কোলে নিয়ে বুকপানি পেরিয়ে নৌকার কাছে ছুটে আসেন আরও ১০ থেকে ১২ জন নারী। বালাডোবার চরের বাসিন্দা তারাও।

তাদের সঙ্গে কথা হলে জানান, ত্রাণের নৌকা ভেবে ছুটে এসেছেন তারাও। কিন্তু ত্রাণের নৌকা না হয়ে সাংবাদিকদের নৌকা দেখে কিছুটা হতাশ হওয়ার কথাও জানান তারা।

একই ইউনিয়নের পার্শ্ববর্তী মশালের চরে নৌকায় বসে দিন কাটানো রুপবানের (৫০) সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, নিজেরা কষ্ট করে খেলেও শিশু বাচ্চাকে ঠিকমতো খাওয়াতেও পারছেন না তিনি। পার্শ্ববর্তী কোনো উঁচু জায়গা না থাকায় ঘর-বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতেও পারছেন না তিনি। ঘরের ভেতর উঁচু করা চুলায় দিনে এক বেলা রান্না করে তা খেয়েই দিন চলছে তাদের।

বন্যাকবলিত চরগুলো ঘুরে দেখা গেছে, দ্রুত পানি নেমে গেলে কষ্ট কিছুটা হলেও কমবে পারিবারগুলোর। আর যদি পানি আরও দীর্ঘ সময় অবস্থান করে, তাহলে অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করতে হবে তাদের।

এ ব্যাপারে উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান বেলাল হোসেন বলেন, আমার ইউনিয়নের দুই হাজার পরিবার পানিবন্দি। বরাদ্দ পেয়েছি পাঁচ মেট্রিক টন চাল, যা ১০ কেজি করে ৫০০ পরিবারের মাঝে শনিবার সকাল থেকে বিতরণ করা হচ্ছে।

প্রায় ১৫ দিনেরও বেশি সময় ধরে ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বেগমগঞ্জের মতো অবস্থা উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী, রাজিবপুর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার অববাহিকার নতুন জেগে ওঠা অন্তত শতাধিক চরের পানিবন্দি মানুষ।

এদিকে নদীভাঙনের কবলে পড়ে নতুন চরে বাড়ি করা পরিবারগুলোরও একই অবস্থা। চলমান বন্যায় জেলার চর ও নিম্নাঞ্চলের প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি জীবন যাপন করছে।

সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউপির চেয়ারম্যান মো. আইয়ুব আলী সরকার বলেন, আমার ইউনিয়নের পানিবন্দি আড়াই হাজার পরিবারের চাহিদা পাঠিয়েছি। এর মধ্যে পাঁচ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পেয়েছি, যা বন্যাকবলিতদের তালিকা করে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে।

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম জানান, বন্যার্তদের জন্য ২৮০ মেট্রিক টন চাল ও সাড়ে ১২ লাখ টাকা বিতরণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নতুন করে আরও ১ হাজার ৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ পাওয়া গেছে, যা বিতরণের কাজ চলছে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম জানান, চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপৎসীমার ৪০ সেন্টিমিটার ও সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি বিপৎসীমার ৬২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন :