ভূরুঙ্গামারীতে লাইসেন্সবিহীন ইটভাটার ছড়াছড়ি

প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১

মো. মনিরুজ্জামান, ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) :

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার কৃষি জমিতে ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে উঠেছে লাইসেন্সবিহীন ইটভাটা। এইসব ইটভাটায় মানা হচ্ছে না কোন আইন কানুন। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ব্যবসা। পুড়ছে ফসলি জমির ঊর্বর মাটি। কার্বন ডাই-অক্সাইড মিশ্রিত কালো ধোঁয়ার বিষ ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে এলাকার পরিবেশ।

 

রংপুর পরিবেশ অধিদপ্তর অফিস সূত্রে জানা গেছে, ভ‚রুঙ্গামারী উপজেলার কোনো ইটভাটারই পরিবেশ অধিদপ্তরের হালনাগাদ ছাড়পত্র নেই। শুধুমাত্র একটি ইটভাটার ১৭ জানুয়ারি ২০ সাল পর্যন্ত ছাড়পত্র ছিল। এখন একটিরও নেই। সরেজমিনে গিয়ে ১০টি ইটভাটার অস্তিত্ব মিলেছে ভ‚রুঙ্গামারীতে। কোনটি কৃষিজমিতে, কোনটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে, কোনটি আঞ্চলিক মহাসড়কের কোলে, অপরিকল্পিতভাবে ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকায়ও গড়ে উঠেছে এসব ইটভাটা।

অথচ ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাহাড়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং লোকালয়ের ৩ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ইটভাটা করা যাবে না। কৃষিজমিতে ইটভাটা তৈরির আইনগত বিধি নিষেধ রয়েছে। এমনকি ভাটায় নিয়োজিত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিরও আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দৃশ্যপটে বিপুল পরিমান ফসলি জমি নষ্ট করে জমির উপরিভাগের ‘টপ সয়েল’ মাটি কেটে ট্রাক্টর দিয়ে এনে তৈরি করা হচ্ছে ইট ।

 

প্রায় প্রতিটি ইটভাটার পাশেই রয়েছে কৃষি জমি। এই কৃষি জমির বেশীরভাগ মালিকরা জানেইনা সরকার তাদের জমির সুরক্ষার জন্য করে দিয়েছে আইন, বেঁধে দিয়েছে নিয়ম, নীতিমালা। পরিবেশের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় তাদের ক্ষতি হলেও ইটভাটার মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় এলাকাবাসী প্রশাসনের কোনো দপ্তরে অভিযোগ দিতে সাহস পায়না।

 

স্থাপিত ইটভাটা এলাকার কৃষক জুলহাস, আকরাম ও ফয়েজ উদ্দিন বলেন, কয়েক বছর আগেও যে জমিতে আমরা ফসল উৎপাদন করেছি এখন সেখানে হয়েছে ইটভাটা। এতে তাদের চাষাবাদ বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি ভাটায় ব্যবহৃত চিমনি দিয়ে নির্গত ধোয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে শত শত বিঘা ফসলি জমি।

এলএম বি ব্রিক্সের সত্ত্বাধিকারী লিয়াকত আলী মোল্লা বলেন, তার ইটভাটার লাইসেন্স নবায়ন না থাকলেও তিনি সরকারী বিধি মেনে এক ফসলি জলডোবা জমিতে জিগজাগ চিমনি ব্যবহার করে ভাটাটি পরিচালনা করছেন।

ভূরুঙ্গামারী উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির আহবায়ক ও কাজী ব্রাদার্স ব্রিকসের স্বত্ত্বাধিকারী কাজী গোলাম মুস্তফা বলেন, আমার জানামতে পাঁচটি ইটভাটার লাইসেন্স আছে কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর ইটভাটার লাইসেন্সের নবায়ন না দেয়ায় চলতি বছর কোন ভাটার লাইসেন্স নবায়ন হয়নি। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এ এস এম সায়েম বলেন, স্বাস্থ্যবিধি না মেনে কাজ করলে ইটভাটায় নিয়োজিত শ্রমিকদের শ্বাসকষ্ট, ডাচ এলার্জি, ফুসফুসের সংক্রমণসহ বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঊপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, বিপুল পরিমান কৃষি জমি নষ্ট হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে এইসব ইটভাটা গড়ে ওঠায়। ভাটায় ইট তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে ফসলি জমির টপ সয়েল। ফলে একদিকে কৃষক হারাচ্ছে বড় অংশের কৃষি উপযোগি জমি অন্যদিকে, ভবিষ্যতে দেখা দিতে পারে ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপক কুমার দেব শর্মা বলেন, উপজেলায় ১০টি ইটভাটা রয়েছে। ভাটার লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের বিষয়টি জেলা প্রশাসক মহোদয় জানেন।

পরিবেশ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের সহকারি পরিচালক ইউছুফ আলী বলেন, ইতোমধ্যে আমরা কয়েকটি উপজেলায় বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালিয়েছি। আমরা সব উপজেলাতেই এই ধরনের অভিযান চালাব। কেউ যদি আইন অমান্য করে ইটভাটা চালায় তাহলে সঠিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. রেজাউল করিম বলেন, ভূরুঙ্গামারী উপজেলার দশটি ইটভাটার মধ্যে সাতটির লাইসেন্স নবায়ন আছে। বিধিমালা লংঘন করে কেউ ইটভাটা পরিচালনা করলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

 

আপনার মতামত লিখুন :