যশোর-মণিরামপুরে ‘চাল চুরির’ মিথ্যা অপপ্রচারে নষ্ট হচ্ছে দলের ভাবমূর্তি

প্রকাশিত : ১১ এপ্রিল ২০২০

যশোর প্রতিনিধি : যশোরে সরকারি চাউল উদ্ধারের পৃথক দুইটি ঘটনা নিয়ে নোংরামী শুরু হয়েছে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মধ্যে। গ্রুপিং-লবিংয়ের রাজনীতিতে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ‘চাউল চোর’ আখ্যা দিয়ে ছবিসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তবে, উদ্ধার হওয়া কোন চাউল ত্রাণের নয় বলে জানা গেছে। তবুও, নিজেদের মধ্যে ‘কাঁদা-ছোঁড়াছুঁড়িতে’ সাধারণ জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি। 

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, যশোরের বাঘারপাড়ায় করোনায় কর্মহীন, অস্বচ্ছল ও সুস্থদের মাঝে বেশ কয়েকদিন ধরে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করছিলেন রাকিবুল হাসান শাওন নামের এক তরুণ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ স্থানীয় গণমাধ্যমে ওই তরুণকে বাহবা দিয়ে একাধিক খবরও প্রকাশ হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, রাকিবুল হাসান শাওন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত। একটি বেসকারি কোম্পানীতে চাকরির পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করছেন বাঘারপাড়া উপজেলা ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদে।

এরইমধ্যে মঙ্গলবার (০৭ এপ্রিল) বিকেলে সরকারি চালসহ গ্রেফতার হয় শাওন। বিষয়টি প্রচার হলে সাধারণ মানুষ থেকে তার পরিচিতজনদের মধ্যে তৈরি হলো অন্যরকম কৌতুহল। প্রশ্ন ওঠে, গত কয়েকদিন ধরে যিনি গরিব-দুঃখি মানুষের মাঝে খাদ্য বিতরণ করছে, তিনি এমন ঘটনায় জড়িত কিভাবে ? এছাড়াও শাওন কোন জনপ্রতিনিধি না হয়েও এ কেলেংকারীতে জড়িত কিভাবে ? এসব প্রশ্নের উত্তর আসার আগেই যশোর জেলা আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপের কর্মীরা শাওনকে ‘চাউল চোর’ আখ্যা দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিতে শুরু করলো। এমনকি, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পেছনে দাঁড়ানো শাওনের ছবিটিও ব্যাপক ভাবে ছড়ানো হলো। ছাত্রলীগ-যুবলীগের কিছু নেতা কর্মী শাওনের সাথে ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বিপুলকে ‘এই চাউল চোরের হোতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বিপুলের ছবিটাও পোস্ট করে ! যা নিমিষেই ফেসবুক দুনিয়ায় ঝড় তোলে।

এ ঘটনার আগে ০৫ এপ্রিল মনিরামপুরের রাইস মিল থেকে ৫৫৫ বস্তা সরকারি চাল উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ঘটনায় মিল মালিক ও ট্রাক চালক আটক হয়। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয় এবং উপজেলা প্রশাসন তদন্ত পৃথক তদন্ত শুরু করে। তবে ঘটনা উদঘাটন হওয়ার আগেই স্থানীয় সংসদ সদস্য ও এলজিআরডিএ প্রতিমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তার ভাগ্নে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক উত্তম চক্রবর্তী বাচ্চুকে ‘চাউল চোর’ আখ্যা দিয়ে ছবিসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে। 

উভয় ঘটনায় জেলাব্যাপী ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ থেকে সারাদেশে এসব ছবি ছড়িয়ে পড়ে। ভিন্ন দলের লোকজন এসব ঘটনা নিয়ে হাসি-ঠাঠ্যার পাশাপাশি ব্যাঙ্গ করে ফেসবুকে পোস্ট অপপ্রচার চালায়। এতে জড়িত না থেকেও কয়েকজন চাউল চোর হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের প্রতিমন্ত্রী ও জনপ্রতিনিধিদের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। শুধুমাত্র যশোর জেলা নই, সারাদেশ ব্যাপী আওয়ামী লীগের এই জনপ্রতিনিধি ও নেতারা চাল চোর হিসেবেই পরিচিতি পায়। এতে জনগণের কাছে দলটির ভাবমূর্তি নষ্ট হয়, গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। 

তবে, একদিন পরেই জানা গেলো উভয় ঘটনায় উদ্ধার হওয়া কোন চাউল ত্রাণের নয়। টেস্ট রিলিফ (টিআর) ও কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) প্রকল্পের সভাপতি-সম্পাদকদের কাছ থেকে গোডাউনের সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা কিনে পরে বিক্রি করেছে। তেমনিভাবেই, রাকিবুল হাসান শাওন খাজুরার একটি আড়ৎ থেকে চার হাজার কেজি (৮০ বস্তা) চাল কিনে একটি গোডাউনে রেখে গরিব-দুঃখী মানুষের জন্য ছোট ছোট প্যাকেট করে বিতরণ করছিলেন। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ বিষয়টি জানতে পেরে এবং চাল ক্রয়ের রশিদ পেয়ে রাকিবুল হাসান শাওনকে মুক্তি দেয়। 
এদিকে, মণিরামপুরে চাল উদ্ধারের ঘটনায় আটক দুইজনের ইতোমধ্যে দুই দিনের রিমান্ড শেষ হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের সভাপতি-সম্পাদকরা ওই চাল  গোডাউন সিন্ডিকেটের কাছে বিক্রি করে যায়। পরে ওই চাল কিনেছিলো মিল মালিকরা। ফলে এগুলো কোন ত্রাণের চাউল নয়।  

৭১ এর ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির জেলা শাখার সভাপতি হারুন অর রশীদ ও সাধারণ সম্পাদক সাজেদ রহমান সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, ‘সংগঠনের বাঘারপাড়া শাখার সাধারণ সম্পাদক রাকিব হাসান শাওনের বিরুদ্ধে চাউল চুরির বদনাম খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই হীন ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান তারা।

যশোর জেলা গোয়েন্দ পুলিশ (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মারুফ আহম্মেদ বলেন, পেপসি গোডাউন থেকে চাউল উদ্ধারের ঘটনায় আমরা আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছি। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, উদ্ধারকৃত চাউল ত্রাণের এমন দাবি তো আমরা করিনি। তদন্তে জানতে পেরেছি, খাজুরার একটি চাউল আড়ৎ থেকে শাওন নামের ওই ব্যাক্তি চাউল ক্রয় করেছে। বিষয়টি জেনে এবং ক্রয় ভাউচার দেখে আমরা তাকে ছেড়ে দিয়েছি। 
 

আপনার মতামত লিখুন :