আবারো চলছে মধুপুরের “ট্রেন স্কুল”

প্রকাশিত : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১

হাফিজুর রহমান, মধুপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি:

ঝক ঝক ঝক ট্রেন চলেছে, রাত দুপুরে অই। ট্রেন চলছে ট্রেন চলছে, ট্রেনের বাড়ী কই? কবি শামসুর রহমানের ট্রেন কবিতার মতই বিরামহীন ভাবে ট্রেনের সাথে ছুটে চলেছিলো টাঙ্গাইলের মধুপুরের দিগরবাইদ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছোট্র ছেলে মেয়েরা।

করোনার কারণে দীর্ঘদিন দিগরবাইদ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়“ ট্রেন স্কুল” টি থেমে যায়। ট্রেন স্কুলটি বন্ধ থাকলেও দর্শনার্থীদের ভীড় ছিলো চখে পড়ার মত। কারণ প্রধান মন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা ও জেলা এবং উপজেলা শিক্ষা অফিসারের পরামর্শে সকল নির্দশন নিজ হাতে “ ট্রেন” আকৃতিতে চিত্রায়ন করেছেন স্কুলটির প্রধান শিক্ষক তারেকুল ইসলাম।

আজ থেকে সরকারী নির্দেশনাঅনুযায়ী সারাদেশের ন্যায় দিগরবাইদ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়টির পাঠদান শুরু হয়েছে। বিদ্যালয় খুলবে এমন খবর পাওয়া মাত্রই আগে থেকেই বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীরা পরিক্ষার পরিচ্ছন্নতার কাজে লেগে পড়েন।

সরেজমিনে বিদ্যালয়টিতে ঢুকতে চোখে পড়ে অফিস কক্ষের সামনে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির জনক স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি মুর‌্যাল সংম্বলিত পানির ফোয়ারা। একটি শহীদ মিনার, শিক্ষার্থীদের মুক্তিযোদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানাতে নির্মাণ করা হয়েছে “বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধ কর্ণার ”সহ মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুম। বিদ্যালয়ের সামনের অংশে লাল সবুজের পতাকার অদলেই রংয়ের চিত্রায়নেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বিদ্যালয় ক্যাম্পাসটি। বিদ্যালয়টিতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা সহ উন্নত মানের পাঠদান দেওয়ার জন্য নানা ধরনের কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষানুরাগী প্রধান শিক্ষক তারেকুল ইসলাম। তবে, বিদ্যালয়টিকে ট্রেনের আকৃতি দেওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা সহ শিশুরা বিদ্যালয়মুখী হয়েছে বেশী সেই সাথে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

গতকাল শনিবার কথা হয় বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাসরিন আক্তার, রোকসানা খাতুন ও উম্মে সালমা সহ রাজিয়া সুলতানা জানান, করোনার মধ্যে আমরা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর বাড়ী বাড়ী গিয়ে হোম ওয়ার্কের কাজ দিয়ে এসেছি। ঠিকমত খোজখবর নিয়েছি যাতে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা ব্যবহত না হয়। আমরা আমাদের বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সহ সকলেই নিজের সন্তানের মত সকল শিক্ষার্থীদের কে পাঠদান করাই। আগামী কাল রবিবার ১২ সেপ্টেম্বর থেকে আবারো আমাদের ট্রেন খ্যাত স্কুল টি চলতে শুরু করবে তাই আমরা অনেক খুশি।

বিদ্যালয়ের মাঠে খেলা করছিলো বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থী তানজিলা,আশরাফুল, পারভেজ ও মশিউর রহমান সহ তৃতীয় শ্রেণীর শিশু শিক্ষার্থী রাফি এরা জানায়, আমরা করোনার কারণে অনেক দিন হলো স্কুলে আসতে পারিনি। বিদ্যালয়ে না আসতে পারলেও স্যার ম্যাডামরা আমাদের বাড়ী বাড়ী গিয়ে পড়া শিখিয়েছেন। তবে আমরা সবচেয়ে বেশী আনন্দিত যে জীবনে ট্রেন দেখিনি, আমাদের স্কুলে আসার পরে ট্রেন স্কুল টি দেখেছি মনে হয় একটি ট্রেন দাড়িয়ে আছে। আমরা আগের থেকে বেশী বেশী কওে স্কুলে যাই কখনো স্কুলের ক্লাশ ফাঁকি দেই না। আমরা উৎসাহের সাথে পড়া লেখা করে যাচ্ছি। স্কুলে ট্রেনের আকৃতি করার জন্য প্রধান শিক্ষক স্যার কে ধন্যবাদ জানাই।

স্থানীয় এলাকাবাসী আবু বকর সিদ্দিক ও মকবুল হোসেন সহ আরো অনেকেই জানান,বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তারেকুল ইসলাম সহ সকল শিক্ষকরাই সকল শিক্ষার্থীদেও নিজের ছেলে মেয়ের মত পড়িয়ে যাচ্ছেন । আমাদের দিগরবাইদ এই স্কুল টিতে বর্তমান প্রধান শিক্ষক তারেকুল ইসলাম যোগদানের পর থেকেই বিদ্যালয়ের মোটামুটি সকল কাজই যেমন বেঞ্জ, টেবিল, পানির পাইপ লাইন, বৈদুতিক লাইন সহ ছোটখাটো সকল কাজই নিজেই করে থাকেন। তবে, করোনার মধ্যে আমাদের এলাকার অনেক ছেলে মেয়েরাই পড়া শুনা থেকে পিছিয়ে পড়েছেন কারণ এটি পহাড়ী গরীব এলাকা। কারো বাড়ীতে টিভি নেই বা ভালো মোবাইল নেই বিদ্যুতের অবস্থা আরো খারাপ। তাই তারা নেটের ক্লাশ থেকে পিছিয়ে পড়ে। তবে সরকার আবারো বিদ্যালয়টি খুলে দেওয়ার কারণে এই অঞ্চলের ছেলে মেয়ে ও অভিভাবকদের জন্য অনেক ভালো হয়েছে।

বিদ্যালয়টি দেখতে আসা অরণখোলা ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক হাসান ইমাম মিন্টু তিনি জানান, জীবনে এই ধরনণের ট্রেন স্কুল কোথায় দেখি নাই । তবে দেখে অনেক ভালো লাগলো। ছেলে মেয়েদের বিদ্যালয়মুখী করতে বিদ্যালয়কে এমন ব্যতিক্রম কিছু করা উচিত বলে আমি মনে করি সেই সাথে স্কুলের প্রধান শিক্ষককে ধন্যবাদ জানাই।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তারেকুল ইসলাম জানান, আমি চাই আমি আমার নিজের সন্তানের মত করে বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থী ও স্কুল ঘর টিকে নিজের ঘর হিসেবে তৈরী করে সন্তানদের পাঠদান দিয়ে মানুষের মত মানুষ করে তুলতে কাজ করে যাচ্ছি। তবে করোনার কারণে বিদ্যলয়টি দীর্ঘদিন বন্ধ ছিলো। কিন্তু তার পরেও সকরাকারী নির্দেশনা মোতাবেক প্রত্যেক শিক্ষার্থীদের বাড়ী বাড়ী গিয়ে আমারা শিক্ষকরা পাঠ দান করিয়েছি। বন্ধ থাকার কারণে বিদ্যালয় মাঠে ঘাস সহ ময়লায় নেংরা হয়ে ছিলো আমি নিজ উদ্যেগে সব পরিক্ষার করেছি।

ট্রেনের আকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে তিনি আরো জানান, পাহাড়ী অঞ্চলের ছেলে মেয়েরা কোনদিন ট্রেন দেখেনি তাই আমি বিদ্যালয়টিকে আকর্ষণীয় করতে ও ঝরেপড়া শিক্ষার্থীদের কে বিদ্যালয়মুখী করতে এই ধরণের কাজ আমি করেছি। তবে করোনার কারণে ছেলে মেয়েদের পড়াশুনা কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছে। তার পরেও আশা করছি স্কুল যেহেতু ১২ সেপ্টেম্বর খুলছে ছেলে মেয়েদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কাজ করে যাব। আমি যতদিন বেঁচে থাকব এই মহান পেশায় থাকব ততদিন প্রতিষ্ঠান সহ প্রতিষ্ঠনের ছেলে মেয়েদের ভালো পড়া শুনা করিয়ে মানুষের মত মানুষ করে তুলব ইনশ্লাহ।

মধুপুর উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ রমজান আলী তিনি জানান, দিগরবাইদ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তারেকুল ইসলাম একজন ব্যাতিক্রম মানুষ। তিনি খুবই শিক্ষানুরাগী। শিক্ষার্থীদেরকে বিদ্যালয়মূখী করতে যা করার দরকার তিনি তাই করে যাচ্ছেন। তবে বিদ্যালয়ের পারিপাশির্^ক পরিবেশ শিক্ষার্থীদের কে পড়া লেখার প্রতি আকৃষ্ট করে তুলবে। সেই সাথে ট্রেন খ্যান প্রাথমিক বিদ্যালয়টি আবারো স্যাফল্যেও গতিতে এগিয়ে যাবে এমনটাই প্রত্যাশা করছি।

মধুপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসারা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম খান তিনি জানান, মধুপুর উপজেলা নয় শুধু কোথায় বিদ্যালয়কে এধরনের চিত্রায়াতি করেনি। বিদ্যালয়টি শিক্ষার ফলাফলের দিকেও অনেক ভালো। তবে করোনার কারণে দীর্ঘ বন্ধ থাকার পরে মধুপুর উপজেলার প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আগামীকাল রবিবার ১২ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ে পাঠদান চলবে।

 

আপনার মতামত লিখুন :