মনোহরদীতে ফসলি জমির মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়, কমছে উৎপাদন ক্ষমতা

প্রকাশিত : ১০ জানুয়ারি ২০২২

মনোহরদী (নরসিংদী) প্রতিনিধি:

নরসিংদীর মনোহরদীতে ফসলি জমির মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়। এতে শত শত বিঘা জমির ফসল নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে উর্বরতা হারিয়ে অনাবাদি হয়ে পড়ছে আবাদি জমি। কমতে শুরু করেছে ফসলের উৎপাদন।

দ্রুত ইটভাটার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে আগামীতে খাদ্য ঘাটতিসহ ফসলি জমি হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন সচেতনরা।

স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় ইটভাটার মালিকরা কৃষকদের প্রলোভন দেখিযে দেদার এক্সাভেটর মেশিন দিয়ে এসব ফসলি জমির মাটি কেটে নিচ্ছে। এরপরও স্থানীয় প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে।

জানা যায়, উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে ২৭টি ইটভাটা আছে। যার অনেকটিরই পরিবেশ অধিদপ্তরের কোন ছাড়পত্র নেই। ইট তৈরীর প্রধান কাঁচামাল মাটি। ফসলি জমির মাটি ইট তৈরীতে সুবিধা। জমির উপরের অংশ তথা টপ সয়েল ইটভাটায় যাওয়ায় জমির উর্বতা ক্ষমতা হারাচ্ছে। ফসলি জমির উপরি ভাগের মাটিতে যে জীপসাম বা দস্তা থাকে তা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এতে করে দিন দিন ফসলি জমিতে উৎপাদন ক্ষমতা কমছে। মাটির জৈব শক্তি কমে গিয়ে দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষতির মুখে পড়ছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, চালাকচর ইউনিয়নের চেঙ্গাইন গ্রামে রফিকুল ইসলাম, মোকলেছ রহমান, সুমন মিয়া, কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের পূর্ব ডোমনমারা বড় বিলে দ্বীন ইসলাম দীনু, লাল মিয়া ও নূর হোসেন, মধ্য ডোমনমারা ও বীরগাঁও থেকে আবুল কাসেম, কাউছার মিয়া ও জাকির হোসেন, বড়চাপা ইউনিয়নের বীর মাইজদিয়া এলাকায় রাতের আঁধারে তাজুল ইসলাম মাস্টার এক্সাভেটর মেশিনের মাধ্যমে ট্রলি ও ড্রাম ট্রাক দিয়ে ফসলি জমির মাটি বিভিন্ন ইটভাটায় নিয়ে যাচ্ছেন। জমির মালিকরা না বুঝেই তা ইটভাটার মালিকদের কাছে বিক্রি করছেন।

গতকাল রবিবার উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পূর্ব ডোমনমারা গ্রামের মাটি ব্যবসায়ী নূর হোসেন নূরু এবং দ্বীন ইসলাম দিনু সেখানে ভ্যাকু মেশিন দিয়ে ফসলসহ সরিষা ক্ষেত ও বোরো ধানের জমির মাটি প্রায় ৬ ফুট গভীর করে কেটে ইটভাটায় নিয়ে যাচ্ছেন। এতে পাশের জমির মালিকদের ফসলি জমি ভাঙনের মুখে পড়েছে।
এ ব্যাপারে মাটি ব্যবসায়ী দিনু ও নূরু ফসলি জমির মাটি কেটে নেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ভূমি অফিসের অনুমতি নিয়ে আমরা মাটি কাটতেছি। আমার মতো মনোহরদীর অনেক ব্যবসায়ী ফসলি জমির মাটি কেটে নিচ্ছেন।

ডোমনমারা গ্রামের কৃষক কাশেম, রবিসহ অনেকেই বলেন, ইটভাটা থেকে লোকজন এসে কৃষকদের মাটি বিক্রয়ের বিষয়ে অনুনয়-বিনয় করে বোঝায়। এতে করে অনেক কৃষক লোভে পড়েই মাটি বিক্রি করে। মূলত ফসলি জমির উপরের অংশের মাটি ইটভাটায় বিক্রি করা হয়ে থাকে। এতে করে দেড় থেকে দুই বছর ওই জমিতে তেমন ফসল উৎপাদন হয় না।

মনোহরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আয়েশা আক্তার জানান, ‘মাটির উপরিভাগের ১০-১৫ ইঞ্চির মধ্যে উর্বরতা শক্তি থাকে। মাটি খুঁড়ে বিক্রি করার ফলে তা পুনরায় ফিরে আসতে সময় লাগে। এ ছাড়া মাটির এই অংশে যে কোনো ফসল বেড়ে উঠার গুণাগুণ সুরক্ষিত থাকে। বীজ রোপণের পর এই অংশ থেকেই ফসল প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান গ্রহণ করে বড় হয়। এটাকে টপ সয়েল বলে। এই টপ সয়েল একবার কেটে নিলে সে জমিতে আর প্রাণ থাকে না।’

উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ ফরিদ বলেন, ‘যেসব এলাকায় নদীর মাটি আছে সেই এলাকার ইটভাটাগুলোতে এবার ফসলি জমির মাটা কাটা হচ্ছে না। তবে কোন এলাকায় ফসলি জমির মাটি ইটভাটায় যাচ্ছে তা আমার জানা নেই।’

কৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান এমদাদুল হক আকন্দ এই বিষয়ে বলেন, ‘আমি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর গত সাড়ে চার বছরে অনেক কষ্ট করে এই রাস্তাগুলোর কাজ করিয়েছি। মাটির ব্যবসায়ীদের কারণে রাস্তাগুলো সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমি ইউএনও এবং অ্যাসিল্যান্ড স্যারকে অবহিত করছি। তারা আশ্বস্ত করলেও এ পর্যন্ত ফসলি জমির মাটি কাটা বন্ধ হয়নি। উপজেলা মাসিক সমন্বয় সভার সিদ্বান্ত অনুযায়ী আমি গতকাল রাতে কয়েকটি ভ্যাকুর চাবি জব্দ করেছি।’

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি জানতে পেরে আমি ওই এলাকায় গিয়েছি। কিন্তু কোন মেশিন বা ট্রাক পাওয়া যায়নি। তবে ফসলী জমির ক্ষতি করে কেউ মাটি কাটালে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আপনার মতামত লিখুন :