গাজীপুরে তৃতীয় দিনের মতো পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ ও ভাংচুর

প্রকাশিত : ১৫ এপ্রিল ২০২০

মঞ্জুর হোসেন মিলন, গজাীপুর : গাজীপুরে লকডাউন নীতি উপেক্ষা করে লাগাতার তৃতীয় দিনের মতো রাস্তায় নেমেছে অন্ততঃ ২৫টি পোশাক কারখানার শ্রমিক। বেতন ভাতা পরিশোধের দাবীতে এসব কারখানার শ্রমিকরা বৃহস্পতিবার পৃথকস্থানে বিক্ষোভ ও অবস্থান ধর্মঘট করেছে। এসময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ঢাকা-গাজীপুর ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কসহ কয়েকটি সড়কের বিভিন্নস্থানে বিদ্যুতের খুঁটি ও গাছ-কাঠ ফেলে সড়ক অবরোধ করেছে। আন্দোলরত শ্রমিকদের সঙ্গে বহিরাগতরাও যোগ দিয়ে কয়েকটি কারখানার গেইট ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করেছে ও ঢিল ছুড়ে জানালার কাঁচ ভেঙ্গেছে।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের এএসপি মোস্তাফিজুর রহমান ও আরিফ রাইয়ানসহ আন্দোলনরত শ্রমিক ও স্থানীয়রা জানান, করোনা পরিস্থিতিতে লকডউন ভেঙ্গে গত কয়েকদিন ধরেই গাজীপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা মার্চ মাসের বেতন ভাতাসহ বকেয়া পাওনাদি পরিশোধের দাবীতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করে আসছে। তৃতীয় দিনের মতো বৃহষ্পতিবারও ওই দাবীতে গাজীপুরের ভোগড়া, শরীফপুর, বোর্ড বাজার, সাইনবোর্ড, ছয়দানা, টঙ্গী, তিনসড়ক, লক্ষ্মীপুরা, সালনা, মেম্বারবাড়ি, শ্রীপুর উপজেলার টেপিরবাড়ী, বাঘের বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় সকাল হতে পৃথকভাবে বিক্ষোভ করেছে অন্ততঃ ২৫টি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধের কোন নিয়ম কানুন না মেনেই রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছে।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের ইন্সপেক্টর শহিদুল ইসলাম, আন্দোলনরত শ্রমিক ও স্থানীয়রা জানান, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের লক্ষ্মীপুরা ও তিনসড়ক এলাকার স্টাইল ক্র্যাফ্ট ও ইন্ট্রাম্যাক্স পোশাক কারখানার শ্রমিকরা তাদের মার্চ মাসের বেতন ভাতা পরিশোধের দাবীতে বৃহষ্পতিবার সকাল হতে কারখানার গেইটে জড়ো হতে থাকে। করোনা পরিস্থিতির কারণে কারখানা দু’টি বন্ধ রয়েছে। শ্রমিকরা কারখানার গেইটে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করলেও মালিক পক্ষের সাড়া না পেয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে এবং বিক্ষোভ শুরু করে। একপর্যায়ে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা কারখানার পার্শ্ববর্তী ঢাকা-গাজীপুর উপর এসে পৃথকভাবে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। এসময় শ্রমিকরা সড়কের পাশ থেকে বিদ্যুতের খুঁটি এবং গাছ ও কাঠের টুকরো টেনে সড়কের উপর এনে ব্যারিকেডের সৃষ্টি করে। এতে সড়কের উভয়দিকে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে ব্যার্থ হয়। পরে পুলিশের মধ্যস্থতায় কারখানার দু’টির মালিকপক্ষের সঙ্গে শ্রমিক প্রতিনিধিদের পৃথক সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে আগামী ২০এপ্রিল ইন্ট্রাম্যাক্স এবং ২৭ এপ্রিল স্টাইল ক্র্যাফ্ট পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বেতন ভাতা পরিশোধের পৃথক ঘোষণা দেওয়া হয়। বেতন পরিশোধের আশ্বাস পেয়ে প্রায় আড়াই ঘন্টা পর আন্দোলনরত শ্রমিকরা তাদের কর্মসূচি স্থগিত করে সড়ক অবরোধ তুলে নিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় যানবাহন চলাচল শুরু করে।  

এদিকে একই দাবীতে মহানগরের সালনাস্থিত পেনোইন গ্রুপের শ্যামলী গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেছে। কারখানার ম্যানেজার জহিরুল ইসলাম শাহীন জানান, এ কারখানায় প্রায় ২৭০০ শ্রমিক কাজ করে। প্রতি মাসের নির্ধারিত ১০ তারিখে শ্রমিকদের বেতন ভাতা পরিশোধ করা হয়। কিন্তু করোনা ভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতে কারখানা ছুটি ঘোষণা করায় শ্রমিকদের মার্চ মাসের পাওনাদি পূর্ব নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। শ্রমিকদের দেওয়া তথ্যে ভ’ল থাকায় অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও পরিশোধ করা যায়নি। বিষয়টি নিয়ে চিন্তা ভাবনা শেষে আগামী ১৮ থেকে ২০ তারিখের মধ্যে শ্রমিকদের পাওনাদি হাতে হাতে পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেয় কারখানা কর্তৃপক্ষ। ওই সিদ্ধান্ত জানানোর আগেই শ্রমিকরা বৃহষ্পতিবার সকালে কারখানার গেইটের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। এসময় শ্রমিকদের সঙ্গে কিছু সংখ্যক বহিরাগতও যোগ দেয়। বহিরাগতরা কারখানার গেইটের একটি অংশ ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করে কিছু মালামাল তছনছ করে। শ্রমিকরা কারখানার পার্শ্ববর্তী ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উপর অবস্থান নিয়ে অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের এএসপি আরিফ রাইয়ান জানান, সালনা এলাকার শ্যামলী গার্মেন্টস কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের খবর পেয়ে মালিক পক্ষের লোকজন ও পুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। পরে পুলিশের মধ্যস্থতায় কারখানার দু’টির মালিকপক্ষের সঙ্গে শ্রমিক প্রতিনিধিদের পৃথক সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে আগামী ১৮ এপ্রিল শ্রমিকদের পাওনাদি পরিশোধের ঘোষণা দিলে দুপুরে আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিত করে শ্রমিকরা কারখানা এলাকা ত্যাগ করে।

এদিকে একই গ্রুপের গাজীপুর সদরের বাঘের বাজার এলাকাস্থিত অপর পোশাক কারখানার শ্রমিকরা এদিন একই দাবীতে বিক্ষোভ করেছে। পরে পুলিশের মধ্যস্থতায় মালিক পক্ষের সঙ্গে শ্রমিক প্রতিনিধিদের বৈঠক শেষে বেতন পরিশোধের তারিখ ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় বলে জানিয়েছেন এ কারখানার ম্যানেজার মিন্টু।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের এএসপি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, একইদাবীতে প্রায় একই সময়ে মহানগরীর ভোগড়া এলাকার ভিএন্ডআর কারখানার শ্রমিকরা কারখানার পার্শ্ববর্তী বাইপাস সড়কে এবং সাইনবোর্ড হারিকেন এলাকার আশোকা গার্মেন্টসের আন্দোলনরত শ্রমিকরা কারখানার পার্শ্ববর্তী ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে। আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে কিছু সংখ্যক বহিরাগত যোগ দিয়ে এসময়ে ওই কারখানার গেইট ভাঙ্গার চেষ্টা করে ও কারখানায় ঢিল ছুড়ে। এতে কয়েকটি জানালার কাঁচ ভেঙ্গে যায়। এছাড়াও মহানগরীর টঙ্গী এলাকার শিশির নীট কম্পোজিট ও আটলান্টিক ফ্যাশনসহ জেলার অন্ততঃ ২৫টি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা এদিন পৃথকস্থানে সকাল হতে বিক্ষোভ করেছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

আপনার মতামত লিখুন :