গাজীপুরে লকডাউনের মাঝে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ ও অগ্নিসংযোগ

প্রকাশিত : ১৭ জুন ২০২০

মঞ্জুর হোসেন মিলন, গাজীপুরঃ গাজীপুরে করোনা ভাইরাসের সামাজিক সংক্রামন রোধের লক্ষে ঘোষিত লকডাউন নীতি উপেক্ষা করে কয়েকটি পোশাক শ্রমিকরা সোমবার রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছে। এদিন এক কারখানার শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ ও টায়ারে আগুন জালিয়ে বিক্ষোভ করেছে।  

পুলিশ, আন্দোলনরত শ্রমিক ও স্থানীয়রা জানান, গাজীপুরের সালনা এলাকায় অক্সফোর্ড সার্ট লিমিটেড নামের একটি তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের পূর্ব নির্ধারিত তারিখ ছিল সোমবার। কারখানার যেসব শ্রমিকদের চাকুরির বয়স ৬মাসের কম ছাটাইয়ের উদ্দেশ্যে সেসব শ্রমিকদের তালিকা তৈরি করে কর্তৃপক্ষ। সোমবার শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের সময় ওইসব শ্রমিকদের পদত্যাগ পত্রে স্বাক্ষর করতে বলে কারখানা পক্ষের লোকজন। এতে শ্রমিকদের মাঝে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে  দুপুরে শ্রমিকরা ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে এবং ছাঁটাইকৃতদের কাজে পুনর্বহালের দাবীতে বিক্ষোভ শুরু করে এবং কারখানার গেইটে অবস্থান নেয়। এসময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের একটি অংশ কারখানা থেকে বের হয়ে পার্শ্ববর্তী ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উপর অবস্থান নিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করে বিক্ষোভ করতে থাকে। তারা মহাসড়কের উপর টায়ার ও কাঠে অগ্নিসংযোগ করে। এতে ওই মহাসড়কের উভয় পাশে পণ্যবাহী ট্রাক ও পিকআপসহ বিভিন্ন গাড়ি আটকা পড়ে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দীর্ঘ চেষ্টার পর অবরোধকারীদের মহাসড়কের উপর থেকে সরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। বিকেলে পুলিশের মধ্যস্থতায় কারখানার মালিকপক্ষের সঙ্গে শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। 
 
জিএমপি’র সদর থানার অফিসার ইনচার্জ আলমগীর হোসেন বলেন, শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে অক্সফোর্ড সার্ট লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরা আন্দোলনে বিক্ষোভ এবং সড়ক অবরোধ করেছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের উদ্যোগে কারখানার মালিক পক্ষের সঙ্গে শ্রমিকদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। 

এদিকে একইদিন বেতন ভাতা পরিশোধের দাবিতে গাজীপুরে টঙ্গীর বিসিক এলাকায় বিক্ষোভ করেছে আলাউদ্দিন অ্যান্ড সন্স প্রাইভেট লিমিটেড পোশাক কারখানার কয়েকশ’ শ্রমিক।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের ইন্সপেক্টর হাবিবুর রহমান, আন্দোলনরত শ্রমিক ও স্থানীয়রা জানান, গাজীপুরের টঙ্গী বিসিক এলাকার সব কারখানা শ্রমিক-কর্মচারীদের মার্চ মাসের বেতন পরিশোধ করে বন্ধ করে দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ওই এলাকার আলাউদ্দিন অ্যান্ড সন্স প্রাইভেট লিমিটেড পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বেতন ভাতা এ পর্যন্ত পরিশোধ করেনি। গত ৫এপ্রিল শ্রমিকদের বেতন ভাতা পরিশোধের তারিখ নির্ধারণ করা হলেও তা পরিশোধ না করেই আগের দিন (৪এপ্রিল) কারখানা বন্ধ করে গেইটে নোটিশ টানিয়ে দেয় মালিক পক্ষ। নোটিশে শ্রমিকদের পাওনাদি পরিশোধের তারিখ ৯ এপ্রিল পুনঃনির্ধারণ করা হয়। এদিকে শ্রমিকরা নির্ধারিত দিনে কারখানার গেইটে এসে বন্ধ এবং বেতন পরিশোধের নতুন তারিখের নোটিশ দেখতে পেয়ে ফিরে যায়। বেতন পরিশোধের পুনঃনির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী শ্রমিকরা ৯এপ্রিল কারখানায় যায়। কিন্তু এদিনও শ্রমিকদের পাওনাদি পরিশোধ না করে পুনঃরায় ১৩ এপ্রিল পরিশোধের নতুন তারিখ ঘোষণা করে। ঘোষিত তারিখ অনুযায়ী সোমবার সকাল হতে শ্রমিক-কর্মচারীরা সকাল হতে কারখানার গেইটে এসে অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু এদিনও তারিখ পরিবর্তন করে  শ্রমিকদের পাওনাদি ১৬ এপ্রিল পরিশোধের পরবর্তী তারিখ ঘোষণা করে কারখানায় মালিক পক্ষ। এতে শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। তারা বার বার বেতন দেয়ার তারিখ পরিবর্তন করার প্রতিবাদে কারখানার সামনে বিক্ষোভ শুরু করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। একপর্যায়ে পুলিশের মধ্যস্থতায় কারখানার মালিকপক্ষের সঙ্গে শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
কারখানার নিটিং অপারেটর মোহাম্মদ ইউছুফ ও সুইং অপারেটর শ্যামলীসহ শ্রমিকরা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই এ কারখানা থেকে আন্দোলন করে বেতন-ভাতা নিতে হয়। আমাদের মার্চ মাসের বেতন ভাতা পরিশোধ না করে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ ঘোষণা করেছে মালিকপক্ষ। অন্যান্য শ্রমিকদের কাছে শুনেছি কর্তৃপক্ষ বলছে যতদিন এই করোনা ভাইরাসের মহামারী চলবে ততোদিন কারখানা বন্ধ থাকবে। কারখানার গেটে এ সংক্রান্ত নোটিশ দেখে শ্রমিকেরা সকাল থেকে বেতনের দাবিতে কারখানার প্রধান ফটকের সামনে বিক্ষোভ করে। 

টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ মো. আমিনুল ইসলাম জানান, কারখানার শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের জন্য একাধিকবার তারিখ নির্ধারণ করা হলেও পরিশোধ করা হয়নি। সোমবার পূর্ব নির্ধারিত তারিখে শ্রমিকরা বেতনের জন্য এসেছিল। কিন্তু এদিনও শ্রমিকরা বেতন না পেয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে উছে। পরে শ্রমিক, পুলিশ ও কারখানা কর্তৃপক্ষ সমঝোতার পর ১৬ এপ্রিল বেতন  দেয়ার কথা ঘোষণা দিলে শ্রমিকরা আন্দোলন ছেড়ে কারখানা এলাকা ত্যাগ করে। 

টঙ্গী শিল্পাঞ্চল পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার এস আলম জানান, পূর্ব ঘোষিত নির্ধারিত তারিখেই শ্রমিকেরা আজ (সোমবার) বেতনের জন্য কারখানায় এসেছিল। পরে কর্তৃপক্ষ আগামী বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বেতন দেয়ার কথা জানালে শ্রমিকেরা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ শেষে চলে যায়। 

আপনার মতামত লিখুন :