ফুড ডেলিভারি: স্বপ্ন পূরণের কাছাকাছি ওরা ২৪ জন

প্রকাশিত : ১৩ আগস্ট ২০২১

ভোরের দর্পণ ডেস্ক:
২৬ বছর বয়সী সাদ্দাম হোসেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও অফিসে খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন। ফুড ডেলিভারি সার্ভিস ফুডপ্যান্ডায় তার চাকরি হয়েছে দুই মাস হলো। এই দুই মাসেই তিনি সুখের দেখা পেয়েছেন। হাতে স্মার্টফোন, পিঠে বড় ঝোলা চাপিয়ে বাইসাইকেলের প্যাডেল মেরে চলে যাচ্ছেন বিভিন্ন গন্তব্যে। সপ্তাহ শেষে যা হাতে পাচ্ছেন, তা নিয়েই তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।

অথচ কিছুদিন আগেও তার জীবন এমন ছিল না। করোনা মহামারি শুরু হলে অন্যদের মতো তার জীবনেও দুর্যোগ নেমে আসে। সাদ্দাম তৃতীয় লিঙ্গ সমাজের অংশ হলেও সেখানে অনেক আগে থেকেই আয়ের পথ বন্ধ ছিল। অভাব-অনটনের মধ্যে দিয়ে চলার সময়ে ফুডপ্যান্ডায় চাকরিটা পান তিনি।

সাদ্দাম অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়শোনা করেছেন। অভাবী সংসার ছিল তাদের। তাই আর পড়াশোনা এগোয়নি। তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় সাদ্দাম, তাই বাবার সঙ্গে টাকা উপার্জনে নেমে পড়েন। কিন্তু সাদ্দাম যে আর ১০ জনের মতো না। ফলে সেখানেও বাধা আসে, কাজ করতে পারেন না। তিনি যে স্বাভাবিক না, সেটা নাকি ৬-৭ বছর বয়সেই বুঝতে পারেন সাদ্দাম। এই অবস্থার মধ্য দিয়ে কিছুদিন বাড়িতে থাকলেও এক সময় তাকে দেশের বাড়ি নোয়াখালী ছাড়তে হয়। ২০১১ সালে চলে যান চট্টগ্রামে। মিশে যান তৃতীয় লিঙ্গের মূলস্রোতে। তারপর কাজ জুটলো ফুডপ্যান্ডায়। এখন মাসে তার আয় ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা। নিজের খরচের জন্য টাকা রেখে বাকি টাকা নোয়াখালীতে মা, ভাইবোনদের পাঠিয়ে দেন।

এখন আর কারও লাথি-গুঁতা খাই না : চাঁদপুরের ওয়াহীদ ইসলাম হাছিব কোরআনে হাফেজ। দাখিল পাস করেছেন। তিনি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। বাবা চট্টগ্রাম বন্দরে চাকরি করতেন। তিনি বেঁচে নেই। বাবার চাকরির সূত্রে ছোটবেলাটা চট্টগ্রামে কাটলেও পরে মায়ের সঙ্গে চলে আসেন চাঁদপুরে। কিন্তু জীবিকার টানে তাকে ফের চলে আসতে হয়েছে চট্টগ্রামে। বলা যায়, চট্টগ্রামে চলে যেতে তিনি বাধ্য হন। চলাফেরায় স্বাভাবিকতা না থাকায় ভালো কাজও পান না কোথাও। এখানে-সেখানে ঠোকর খেয়ে থাকতে হয় তাকে।

শেষেমেষ ২-৩ বছর আগে মিশে গেছেন তৃতীয় লিঙ্গের সম্প্রদায়ের সঙ্গে। মায়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হয় তার। মাঝে মাঝে বাড়িতে গিয়ে মাকে দেখে আসেন। মাকে খরচ পাঠান। ওয়াহীদ ইসলাম হাছিব বলেন, ‘মা আমাকে অনেক আদর করেন। সন্তান তো। মায়ের কাছে আমি তো তার ছেলে। সমাজের চোখে যা-ই হই না কেন। হিজড়া হয়ে জন্ম নেওয়ায় আমার তো কোনও দায় নেই।’

ফুডপ্যান্ডায় চাকরি করতে ভালো লাগছে জানিয়ে হাছিব বলেন, ‘সবাই (সহকর্মীরা) অনেক সহযোগিতা করেন। সম্মান করেন। যাদেরকে খাবার ডেলিভারি দিই, তারাও বিষয়টি ভালোভাবেই নেন। একটা সম্মানের জীবন পেয়েছি। এখন আর কারও লাথি-গুঁতা খাই না।’ আগের জীবনের কথা মনে করে তিনি বলেন, ‘এখন অনেক ভালো আছি। কোনও খারাপ লাগা কাজ করে না।’

ফুডপ্যান্ডায় ওরা ২৪ জন : শুধু সাদ্দাম বা হাছিব নয়, এরকম ২০ জন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ ফুডপ্যান্ডার ডেলিভারিম্যান (রাইডার) হিসেবে কাজ করছেন। এরমধ্যে ১০ জন পুরনো ঢাকায়, ১০ জন চট্টগ্রামে। কাজে নিয়োগ দেওয়ার পরে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কীভাবে খাবার ডেলিভারি দিতে হয়, আচরণ কেমন হতে হবে, কীভাবে অর্ডার নিতে হয়, গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলতে হয় ইত্যাদি বিষয়ে তাতাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে পরিপূর্ণ করে তোলা হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের প্রত্যেককে বাইসাইকেল, স্মার্টফোন ও খাবার বহন করার জন্য ডেলিভারি ব্যাগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আরও চার জনকে ফুডপ্যান্ডার ওয়্যার হাউজে চাকরি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। ভবিষ্যতে তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যদের আরও চাকরি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ফুডপ্যান্ডার।

তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীকে আরও চাকরি দেবে ফুডপ্যান্ডা : ফুডপ্যান্ডার প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মানীষা সাফিয়া তারেক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বৈচিত্র্যময় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিবেশ ও সমাজ গঠনে আমরা চেষ্টা করছি তৃতীয় লিঙ্গ, লিঙ্গ বৈচিত্র্য ও লিঙ্গ রূপান্তরিত জনগোষ্ঠীর সামাজিক এবং আর্থিক উন্নতির জন্য সুযোগ তৈরি করে তাদের পাশে দাঁড়ানোর। এজন্য রাইডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, স্মার্টফোন ও বাইসাইকেলসহ অন্যান্য সরঞ্জাম তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, যাতে করে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। আমরা চেষ্টা করছি, সামনের দিনগুলোতে এই জনগোষ্ঠী থেকে আরও বেশি সংখ্যক মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি করতে। এর ফলে তারা আত্মনির্ভরশীল হতে পারবেন এবং অর্থনীতিতে আরও সক্রিয়ভাবে অবদান রাখতে পারবেন।’

ওরা সমাজের দায় নয় : তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন, উন্নত জীবনমান নিয়ে কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠান ‘বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’র সাবেক পরিচালক ও সমাজকর্মী মো. ফসিউল আহসান ফুডপ্যান্ডার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘এতে করে ওরা ক্রমেই মূলধারার অংশ হয়ে যাবে।’ তিনি মনে করেন, সরকার তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়ায় বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান তাদের দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে— তারা তোলা তোলে, এর-ওর কাছ থেকে জোর করে টাকা নেয়। অনেকে বিরক্ত হয়। এই কর্মসংস্থানের ফলে ওদের একটা সম্মানজনক অবস্থান তৈরি হবে। ওদের প্রতি সবার দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক হবে।’

ফসিউল আহসান মনে করেন, সমাজ তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীকে মনে করতে পারে ওরা সমাজের দায়। এখন যেহেতু ওরা বিভিন্ন পেশায় প্রবেশ করছে, ফলে ওরা আর দায় হয়ে থাকছে না। বোঝা হচ্ছে না কারও। তারা কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজেদের একটা সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন :