বিপণন সংকটে পথে বসার আশঙ্কা ২শ কলাচাষির

প্রকাশিত : ২২ এপ্রিল ২০২০

 দেশের অন্যতম কলা চাষের এলাকা টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়াঞ্চলের হাজার হাজার একর বাগানের কলা গাছেই পেকে যাচ্ছে। করোনার প্রভাবে বিপণন সংকটে দুই শতাধিক চাষি কলার ছড়ি গাছ থেকে কাটতে সাহস পাচ্ছেন না।

দেশের বিভিন্ন স্থানের যে সব পাইকাররা অগ্রিম দর নির্ধারণে চুক্তি করেছিলেন তারাও বাজারে চাহিদা না থাকায় চাষিদের কাছ থেকে কলা নিয়ে ঝুঁকিতে যেতে চাচ্ছেন না। ফলে মধুপুর গড়াঞ্চলের প্রায় ১০ হাজার একর (৪ হাজার হেক্টর) জমির কলা গাছের ছড়িতেই পেকে হলুদ হয়ে যাচ্ছে। এতে কৃষকরা কোটি কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা করছেন।

কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, গড়াঞ্চলের প্রায় ১০ হাজার একর (৪ হাজার হেক্টর) জমিতে সাগর ও কবরি জাতের কলা চাষ হয়েছে। এই কলা চাষে সার ও কীটনাশকসহ অনেক টাকা খরচ হয়েছে। বর্তমানে কলা কাটার সময় হয়েছে। মোটামুটি লাভসহ খরচ তুলতে ছড়া প্রতি গড়ে ২৫০-৩৫০ টাকা করে বিক্রি করতে হবে। এমন দামেই বিক্রি হয় কলা। তবে এবার করোনা ভাইরাসের প্রভাবে এখন এ কলা বাজারজাত করতে বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে চাষিদের।

মধুপুরের কলাচাষি আনিছুর রহমান হীরা। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি একটি প্রাইভেট ব্যাংক থেকে ৫০ লাখ টাকা কৃষিঋণ নিয়ে বনাঞ্চলের ৫০ একর জমিতে কলা চাষ করেছেন। কলা চাষ করতে গিয়ে তিনি আরও ৪০ লাখ টাকা বাকিতে সার ও কীটনাশক নিয়ে কলা বাগানে ব্যবহার করেছেন। গাছ থেকে কলা কাটার ভরা মৌসুম আসন্ন। ৩৪০ টাকা (ছড়ি) দরে পাইকারের কাছ থেকে তিনি ইতোমধ্যে অগ্রিম টাকা নিয়েছেন। এরই মধ্যে কলা বাগানেই পাকতে শুরু করেছে। এখন পাইকার কলা নিচ্ছেন না। তার ভাষ্য মতে, কম করে হলেও তিনি দেড় কোটি টাকার কলা বিক্রি করতেন। কিন্তু করোনার প্রভাবে কলার চাহিদা একেবারেই নেই। 

তিনি আরও জানান, তার লেয়ার মুরগির খামার রয়েছে, এই মুরগি চাষেও ধস নেমেছে। কি পরিমাণ লোকসান যে হবে এবং বাকি ও ব্যাংক লোন কিভাবে শোধ করবেন এ নিয়ে তিনি খুবই চিন্তায় আছেন।

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাসিন্দা বড় ব্যবসায়ী মো. সেলিম উদ্দিন মধুপুরের কলা কিনে চট্টগ্রামের চকোরিয়া, সাতকানিয়া, কক্সবাজার, টেকনাফে সরবারহ করেন বেশ কয়েক বছর ধরে। তিনি এই সংকটে বেকায়দায় পড়েছেন। কলা কেনার জন্য চাষিদের কাছে অগ্রিম টাকা দিয়েছেন। 

তিনি জানান, গাছ থেকে কলা কেটে হয়ত আনা যাবে। কিন্তু ক্রেতা বা ভোক্তা না থাকলে দুর্ভোগ ও লোকসান দুই পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। 

তিনি জানান, মধুপুরের কলা চাষিরা বর্তমানে কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়েছেন। মনে হচ্ছে তাদেরও ব্যবসা গুটিয়ে বসে থাকতে হবে।

মধুপুর কলা চাষি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান সহ সভাপতি সার্জেন্ট (অব.) গোলাম কিবরিয়া মতি ৩০ বিঘা জমিতে কলা চাষ করেছেন। 

তিনি জানান, তার ১২ হাজার গাছের মধ্যে ইতোমধ্যে ২ হাজার গাছ ভাইরাসে (স্থানীয় নাম ‘পানামা’) নষ্ট  হয়ে গেছে। বাকি ১০ হাজার গাছের কলা কেনার কেউ নাই। গত দুই দিনে ভ্যান-রিকশায় করে কয়েক ছড়ি কলা বাজারে তুলে একদিনে দু’শ টাকা পকেটে তুলেছেন। পরের দিন ১শ টাকা পকেট থেকে ভ্যান ভাড়া দিতে হয়েছেন। 

তিনি আরও জানান, ২/৩ বছর ধরে কলা বাগানে অজানা একটি ভাইরাসের (স্থানীয় নাম-পানামা) আক্রমণ শুরু হয়েছে। কোনো ওষুধে কাজ হয় না। তারপরও কিছুটা লাভের মুখ দেখতেন। কিন্তু এবার করোনার প্রভাবে লাভ তো দূরের কথা মূল টাকা তোলাও অসম্ভব।  

আক্ষেপ করে তিনি আরও বলেন, এখন ভিক্ষায় বের হতে হবে।
মধুপুরে ১২৬ সদস্যের কলা চাষি সমিতির বাইরে আরও ৭০/৮০ জন কলা চাষি রয়েছেন। সবারই একই দশা। 

এ তথ্য দিয়ে সমিতির সভাপতি শীর্ষ কলা চাষি আব্দুর রহিম জানান, অধিকাংশ বন বিভাগের জমিতেই কলা বাগান রয়েছে। ওই জমির ওপর ব্যাংক কোনো লোন দেয় না। মহাজনী লোন আর সার কীটনাশকের দোকান থেকে বাকি নিয়ে সবাই কলাসহ ফসলাদি চাষ করেন। একে তো কলার ভাইরাস মধুপুরের কলা চাষিদের লোকসানে ফেলে দিয়েছে। কৃষি বিভাগের কোনো চেষ্টা কাজে আসেনি। অপরদিকে কীটনাশক কোম্পানিগুলো চটকদার কথা বলে উচ্চ মূল্যে মেডিসিন দিয়ে শুধু টাকাই হাতিয়ে নিয়েছে। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। কলা চাষে এমন বিপর্যয়ে নতুন করে করোনা ভাইরাস চাষিদের অস্তিত্বে হানা দিয়েছে।

মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান জানান, যেহেতু সংরক্ষণের সুযোগ নেই তাই করোনা প্রভাবে কৃষকদের কলা বিপণন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়া স্বাভাবিক। চিন্তিত চাষিরা তাড়াহুড়ো করে বাজারে যে কলা তুলছেন সেগুলো পাকতে আরও ১৫ দিন লাগবে। আস্তে ধীরে গাছ থেকে কলা কেটে বাজারজাত করলে লোকসান কিছুটা কমবে। দুশ্চিন্তা না করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কলা কাটার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

আপনার মতামত লিখুন :