শ্রীমতি ঝর্ণা ধারার প্রথম প্রয়ান দিবসে বিশেষ প্রার্থনা

প্রকাশিত : ২৭ জুন ২০২০

নোয়াখালী প্রতিনিধ : মহুসী নারী শ্রীমতি ঝর্ণা ধারা চৌধুরীর প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে নোয়াখালী গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টে শনিবার সকাল ১১ টায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রয়াতের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ণ্য, প্রদীপ প্রজ্জলন, বিশেষ প্রার্থনা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনা সভায় গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট সচিব তরনি কুমার দাস এর সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন, রাহা নব কুমার, গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের পরিচালক প্রশাসনিক কর্মকর্তা শংকর বিকাশ পাল, অসীম কুমার বকসী, পিস কডিনেটর। কামাল হোসেন মাসুদ, সংস্কৃতিকর্মী ও দৈনিক ভোরের দর্পনের জেলা প্রতিনিধি দিদারুল আলম প্রমূখ।

উল্লেখ্য, ১৯৪৬ সনে ভ্রাতৃঘাতি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরেই মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালীতে আগমন করেন এবং সহকর্মীদের নিয়ে দাঙ্গাপীড়িত মানুষের মাঝে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ শুরু করেন। সে সময় গান্ধীকর্মীদের সমাজসেবামূলক কাজ দেখে শ্রীমতি ঝর্ণা ধারা চৌধুরী উদ্বুদ্ধ হন এবং এই শিশু বয়সেই নিজেকে সমাজসেবায় উৎসর্গ করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন।

প্রথমেই তিনি লক্ষ্য করেন, অশিক্ষার কারণে সমাজের নারীরা চরমভাবে অবহেলিত ও নিগৃহের শিকার হয়। এই উপলব্ধি থেকেই ১৯৫৩ সালে নারীদের শিক্ষার জন্যে তাঁর বড় বোন কবিতা দত্ত সহ ‘‘কল্যাণী শিক্ষায়তন’’ নামে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেন। কিন্তু নারী শিক্ষা বিরোধীতাকারীদের চক্রান্তের কারণে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তিনি ১৯৬০ সালে চট্টগ্রামে অবস্থিত প্রবর্তক সংঘে যোগদান করেন। যেখানে শিক্ষিকা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ন পদে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনি প্রবর্তক সংঘের প্রায় ৫ শতাধিক কিশোরীকে নিরাপদে বহু প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে ত্রিপুরার রিলিফ ক্যাম্পে নিয়ে যান এবং সেখানে গিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন। প্রবর্তক সংঘে যোগদানের পরপরই তিনি সাধারন দেশী চরকা ও অম্বর চরকার উপর প্রশিক্ষণ গ্রহন করেন। এরপর প্রবর্তক সংঘে চরকা ও তাঁত শিল্প পুন:প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহন করেন। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার জন্য তা বাস্তবায়িত হতে পারেনি ।

এরপর ১৯৭৯ সালে বর্তমান গান্ধী আশ্রমে যোগদান করে হতদরিদ্র নারীদের সংগঠিত করার কাজ শুরু করেন। নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, কর্মমূখী প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে হাজার হাজার নারীর জীবনমান উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখেন। গ্রামের হতদরিদ্র নারীদের স্বাবলম্বী হবার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে তাদের হস্ত ও কুটির শিল্পের উপর প্রশিক্ষণ প্রদান, আর্থিক সহায়তা ও উৎপাদিত পণ্য বিপননের উদ্যোগ গ্রহন করেন। স্থানীয় প্রজাতির গাছের বাকল থেকে শীতল পাটি তৈরী, নারকেলের ছোবড়া থেকে পাপশসহ নানাবিধ উপকরন তৈরী, কাঁথা, কম্বল ইত্যাদি তৈরীর মাধ্যমে এলাকায় ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরী হয়। এরপর তিনি খাদি প্রসারের উদ্যোগ গ্রহন করেন। তুলা থেকে সুতা তৈরী করে তার থেকে কাপড় বুনে বাজারজাত করন শুরু করেন ।

নিজের ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য শ্রীমতি চৌধুরী ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে খাদি ও অন্যান্য বিষয়ে কর্মরত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পূর্বক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং গান্ধী আশ্রমের চলমান কর্মকান্ডকে সমৃদ্ধ করেন।

গান্ধী আশ্রমের উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান সর্বজনবিদিত। এই প্রতিষ্ঠানের পণ্য সামগ্রী বিশেষত: বিভিন্ন ডিজাইনের থান কাপড়ের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে এবং যার কৃতিত্বের দাবিদার শ্রীমতি ঝর্ণা ধারা চৌধুরী ।

গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের উৎপাদিত পণ্য সামগ্রী স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রদর্শণীতে অংশ গ্রহন করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে এবং পুরষ্কার পেয়েছে ।

বাংলাদেশে খাদির পুন: প্রসার ও প্রচারের ক্ষেত্রে গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে । ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলাধীন নতুন মুন্সীর হাট নামক স্থানে ১৯৪৮ সাল অবধি তদানিন্তন পূর্ব বঙ্গের সব থেকে বড় খাদি প্রতিষ্ঠান ছিল এবং এখান থেকে খাদি কাপড় পশ্চিম বঙ্গের সোদপুর সহ সারা ভারতে যেতো। কিন্তু ১৯৪৮ পরবর্তী সময়ে সে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিষ্ঠানের সব সম্পত্তি দখল হয়ে যায় এবং সবকিছু লুটপাট হয়ে যায়।

১৯৭১ সনে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে ঘর-বাড়িগুলো আগুনে পুড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেয়া হয়। শ্রীমতি ঝর্ণা ধারা চৌধুরীর তৎপরতায় নব্বইয়ের দশকে পুনরায় প্রতিষ্ঠানটিতে প্রাণসঞ্চার হয়। বর্তমানে সেখানে খাদি ও কাপড় উৎপাদনের কাজ চলছে এবং বহু নারী ও পুরুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরী হয়েছে।

এছাড়া কুমল্লিাস্থ অভয় আশ্রম পুনর্গঠনের কাজ চলছে শ্রীমতি চৌধুরীর নেতৃত্বে। খাদি ও হস্ত কুটির শিল্পের উন্নয়নের জন্য ঈবহঃৎব ভড়ৎ ঐধহফরপৎধভঃং ধহফ অষঃবৎহধঃরাব জবংবধৎপয ড়হ কযধফর– ঈঐঅজকঅ   নামে গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টে একটি গবেষনা ইউনিট খোলা হয়েছে শ্রীমতি ঝর্ণা ধারা চেীধুরীর নেতৃর্ত্বে। বর্তমানে গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের সরাসরি তত্বাবধানে ৩৫টি তাঁত চলছে। যা শুধু মাত্র নারী দ্বারা পরিচালিত এবং যেখানে শতাধিক নারী কর্মী কর্মরত রয়েছেন ।

শ্রীমতি ঝর্ণা ধারা চৌধুরী ১৯৩৮ সনের ১৫ অক্টোবর বর্তমান লক্ষীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার কালুপুর গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। মা আশালতা দেবী ও বাবা প্রমথ চৌধুরী। ব্যক্তিগত জীবনে চিরকুমারী, সংসার ত্যাগী এবং মহাত্মা গান্ধীর ত্যাগের ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্থ একজন সদালাপী মানুষ। মহাত্মা গান্ধীর ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি আজীবন খাদি কাপড় পরিধান করেছেন এবং নিরামিষ খাবার গ্রহন করেছেন।

তাঁর কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ তিনি আন্তর্জাতিক বাজাজ পুরস্কার-১৯৯৮, শান্তি পুরস্কার-ওল্ড ওয়েষ্টবেরি বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকা-২০০০, অনন্যা পুরষ্কার -২০০১, দূর্বার নেটওয়ার্ক পুরষ্কার – ২০০৩, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পিচ এন্ড কনফ্লিক্ট বিভাগ থেকে শান্তি পৃরষ্কার -২০০৬, সাদা মনের মানুষ হিসাবে স্বীকৃতি-২০০৭, শ্রীচৈতন্য পদক ২০১০, কীর্তিমতী নারী -২০১০ (চ্যানেল আই এবং স্কয়ার),রণবীর সিং গান্ধী স্মৃতি শান্তি সদ্ভাবনা পুরষ্কার-২০১১,ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মশ্রী পুরস্কার-২০১৩, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বেগম রোকেয়া পদক-২০১৩ বাংলাদেশের জাতীয় পুরষ্কার ‘একুশে পদক’-২০১৫, ডেইলি স্টার কর্তৃক সম্মাননা- ২০১৬ ইত্যাদি।

 

আপনার মতামত লিখুন :