ঋণের টাকায় শ্রমিকদের অগ্রীম বেতন দিয়ে বাবার পরিচয় দিয়েছেন শিল্প মালিক

প্রকাশিত : ১০ এপ্রিল ২০২০

এমদাদুল হক, শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি: আমি নারায়ণগঞ্জে মাত্র ৩০টি মেশিন নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলাম। আমার বাড়িগাড়ি, সরকারের দেওয়া সিআইপি (বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি) মর্যাদা সবকিছুর পেছনে এই শ্রমিকদের অবদান রয়েছে। আমার কারখানায় বর্তমানে ৩ হাজার ৩’শ শ্রমিক কাজ করে। তাঁর কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের অগ্রিম বেতন দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে এস পি গ্রæপের এ এম সি নিট কম্পোজিট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ম্যানেজিং ডাইরেক্টর) সুবল চন্দ্র সাহা শ্রমিকদের ঘাম ঝড়া কষ্টের কথা স্বীকার করে এভাবেই কথাগুলো বলেন।    

বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার লোকজন কমবেশি এ করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের সময়ে সংকটে থাকবে। এই দুঃসময়ে কীভাবে তাঁদের অবদান অস্বীকার করব? শ্রমিকদের হাতে টাকা নেই। বাসা ভাড়া ও দোকান বকেয়ার টাকা দিয়েই তাদের মার্চের বেতনের টাকা খরচ হয়ে যাবে। কারখানা বন্ধ থাকায় এখন তাঁদের সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়বে। সার্বিক বিষয় চিন্তা করে দেখলাম এপ্রিলের বেতনটা হাতে থাকলে তারা সংকটে পড়বেন না। অনেক প্রতিষ্ঠান এ পরিস্থিতিতেও শ্রমিকদের দিয়ে জোর করে কাজ করাচ্ছে। ব্যয় কমাতে শ্রমিক ছাঁটাই করছে বা তাঁদের অর্ধেক বেতন দিচ্ছে অনেকে প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে তৈরি পোশাক কারখানার বিরুদ্ধে এমন সব অভিযোগ উঠছে।    

এর মধ্যেও ব্যতিক্রমী উদাহরণ সৃষ্টি করেছে এস পি গ্রæপ। গাজীপুর সদর উপজেলার বানিয়ারাচালা (মেম্বারবাড়ী) এলাকায় অবস্থিত এস পি গ্রæপের এ এম সি নিট কম্পোজিট লিমিটেড কারখানা। এ কারখানায় কাজ করেন ৩ হাজার ৩’শ শ্রমিক-কর্মচারী। করোনাভাইরাস বিস্তার রোধে গত ২৫ মার্চ থেকে কারখানাটি ছুটি। কিন্তু শ্রমিকদের মার্চ মাসের বেতন-ভাতার পাশাপাশি এপ্রিল মাসের বেতনও অগ্রিম দেওয়া হয়েছে। শ্রমিক-কর্মচারীদের দেওয়া হয়েছে ঈদ বোনাস ও চাকরি না হারানোর নিশ্চয়তা। শ্রমিকদের সার্বিক দিক ও সুরক্ষার কথা চিন্তা করেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান এস পি গ্রæপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুবল চন্দ্র সাহা। 

তিনি আরো বলেন, ইউরোপের ক্রেতারা তাদের ক্রয়াদেশ স্থগিত করেছে। এরপরই আমরা কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে হাতে পর্যাপ্ত টাকা ছিল না। একটি বে-সরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছি। ওই ঋণের টাকা দিয়ে ৩ হাজার ৩০০ শ্রমিক-কর্মচারীদের দুই মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধ করেছি।

করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে গত ২৩ মার্চ থেকে দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ছুটি ঘোষণা করা হয়। তবে তখন তা আমলে নেননি তৈরি পোশাক কারখানার অনেক মালিক। ২৫ মার্চ পোশাক কারখানাগুলোর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেন। এরপর তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ তাদের সদস্যদের প্রতি কারখানা বন্ধের অনুরোধ জানায়। সে অনুযায়ী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা বন্ধ ছিল। তবে এই সাধারণ ছুটির মধ্যেই ৫ এপ্রিল কারখানা চালুর ঘোষণা দেন মালিকেরা। করোনাভাইরাসের ঝুঁকির মধ্যে গাড়িও বন্ধ। এর মধ্যেই বহু কষ্টে কর্মস্থলে ফেরেন লাখো শ্রমিক। এ নিয়ে কঠোর সমালোচনা শুরু হয়। সমালোচনার মুখে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে আবার বাড়ি ফিরে যেতে থাকেন শ্রমিকেরা।

সুবোল চন্দ্র বলেন, মালিক নয়, একজন নাগরিক হিসেবে শ্রমিকদের এই দুর্ভোগ আমাকে ব্যথিত করেছে। হাজার হাজার শ্রমিক রোদে পুড়ে হেঁটে কর্মস্থলে ফিরেছেন। পরদিন আবার তাঁরা দলে দলে বাড়ি ফিরে গেছেন। আমি করোনাভাইরাসের ভয়ে দিনের পর দিন কারখানায় যাইনি। শ্রমিকদের কেমন করে কাজে আসতে বলি?’

তিনি বলেন, অনেকেই বলছেন, শ্রমিকেরা কেন গ্রামে ফিরে গেলেন। কিন্তু কেউ বোঝার চেষ্টা করছেন না, ওরা ছোট্ট একটা ঘরে চার-পাঁচজন মিলে বসবাস করেন। একটু ভালো থাকার জন্য গ্রামের চলে যাওয়াটা অন্যায় নয়। এটাই সত্য যে জীবনের সবটুকু সময় দিয়ে শ্রমিকেরাই এই খাতটাকে টিকিয়ে রেখেছেন। এই খাতের মূল চালিকা শক্তি তাঁরাই। তাই শ্রমিকদের অবশ্যই যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে।

করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে গত ২৩ মার্চ থেকে দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ছুটি ঘোষণা করা হয়। তবে তখন তা আমলে নেননি তৈরি পোশাক কারখানার অনেক মালিক। ২৫ মার্চ পোশাক কারখানাগুলোর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেন। এরপর তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ তাদের সদস্যদের প্রতি কারখানা বন্ধের অনুরোধ জানায়। সে অনুযায়ী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা বন্ধ ছিল। তবে এই সাধারণ ছুটির মধ্যেই ৫ এপ্রিল কারখানা চালুর ঘোষণা দেন মালিকেরা। করোনাভাইরাসের ঝুঁকির মধ্যে গাড়িও বন্ধ। এর মধ্যেই বহু কষ্টে কর্মস্থলে ফেরেন লাখো শ্রমিক। এ নিয়ে কঠোর সমালোচনা শুরু হয়। সমালোচনার মুখে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে আবার বাড়ি ফিরে যেতে থাকেন শ্রমিকেরা।

কারখানার সুইং সুপারভাইজার নওগাঁ সদর উপজেলার দশপাইকা গ্রামের রাজু আহম্মেদ বলেন, আমি ১২ বছর যাবত এ করাখানায় চাকরী করে আসছি। অপারেটর থেকে এখন সুপারভাইজার হয়েছি। আমাদের স্যার (মালিক) আমাদের এপ্রিল মাসের অগ্রীম বেতন দিয়ে বাবার পরিচয় দিয়েছেন। এ যুগে একজন বাবাও তার ছেলেকে কাজ ছাড়া টাকা দিতে চায় না। আমরা এতে অনেক খুশি হয়েছি। তাছাড়া এ কারখানায় যখন-তখন ছাঁটাই ও চাকুরীচ্যুতির কোনো ভয় নেই। 

সুইং শাখার নারী সুপারভাইজার ময়মনসিংহের পারভীন আক্তার বলেন, আমি এ কারখানায় ৫০৬ বছর যাবত চাররি করতেছি। আমাদের স্যার (মালিক) যে কাজ করেছে এতে আমরা সন্তুষ্ট। স্যার করোনা ভাইরাসে থেকে যেন মুক্ত থাকতে পারি এবং চলতি মাসের চলার (খরচ) কথা চিন্তা করে আমাদেরকে এপ্রিল মাসের বেতনও দিয়ে দিয়েছে। এতে কারখানার সকল শ্রমিকদের চাকরি নিয়েও কোন টেনশনে থাকতে হবে না।

কারখানার কাটিং অপারেটর ময়মনসিংহের তারাকান্দা থানার মেঘাহালা গ্রামের তৈয়ব আলী জানান, কারখানার বন্ধের দিন (২৫ মার্চ) মালিক স্যার আমাদের দুই মাসের (মার্চ ও এপ্রিল) বেতন এক সাথে দিয়ে ছুটি দিয়ে দিয়েছে। কারখানার স্যারেরা আমাদেরকে নিয়ে অনেক সচেতন। আমরা স্যারদের এরকম ব্যবহারে খুব খুশী। স্যারদের এমন আচরনে আমাদের বাড়ীতে যেতেও ইচ্ছা হয় না। মনে আমরা আমাদের মা-বাবার কাছেই আছি। 

আপনার মতামত লিখুন :