ভাসানচর থেকে দলে দলে পালিয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা

প্রকাশিত : ২৪ জুলাই ২০২১

ভোরের দর্পণ ডেস্কঃ

শরণার্থী ও ত্রাণ প্রত্যাবাসন কমিশনের অতিরিক্ত কমিশনার (উপসচিব) মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন আজকের পত্রিকাকে জানান, ভাসানচর থেকে কী  পরিমাণ রোহিঙ্গা পালিয়ে গেছে, তা আমাদের জানা নাই। তবে পত্রপত্রিকায় দেখছি, বিভিন্ন জায়গায় রোহিঙ্গারা আটক হচ্ছে।

ভাসানচরের ক্লাস্টার-৫০-এর রোহিঙ্গা বাসিন্দা মঞ্জুর আলম মাঝি আজকের পত্রিকাকে জানান, ৫০০ থেকে ৭০০ রোহিঙ্গা ভাসানচর থেকে পালিয়ে গেছে। তিনি আরও জানান, `আমরা এখানে ভালো নাই। এখানে কোনো  কাজকাম নাই। এখানে আমাদের কোনো  আত্মীয়-স্বজন নাই। আমাদের সঙ্গে কথা ছিল ছয় মাস পর পর কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেওয়া  হবে, কিন্তু এখন আমরা তাদের সঙ্গে দেখা করতে পারছি না। এভাবে চলতে থাকলে আরও অনেকে পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

ভাসানচরের ক্লাস্টার-৫০-এর আরেক রোহিঙ্গা বাসিন্দা আমেনা বেগম (ছদ্ম নাম) আজকের পত্রিকাকে বলেন, `এখানে আমার আত্মীয়স্বজন কেউ নাই। আমি আট বছরের এক মেয়েকে নিয়ে থাকি। এখান থেকে ২ হাজারের মতো রোহিঙ্গা পালিয়ে গেছে।’

ভাসানচরের ক্লাস্টার-৫০-এর রোহিঙ্গা বাসিন্দা জিয়াউর রহমান জিয়া আজকের পত্রিকাকে বলেন, `ভাসানচরে আমরা ভালো নাই। এখান থেকে পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গা পালিয়ে গেছে।’

এ প্রসঙ্গে শরণার্থী ও ত্রাণ প্রত্যাবাসন কমিশনার শাহ রেজওয়ান হায়াত রোহিঙ্গারা সারা দেশে ছড়িয়ে যাচ্ছে কথাটি স্বীকার করে আজকের পত্রিকাকে বলেন, বিশেষ করে ভাসানচরের রোহিঙ্গারা সেখানে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে না। তারা বিভিন্ন দালালের মাধ্যমে ওখান থেকে বের হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। তাদের অনেকে অবৈধভাবে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছে।

ভাসানচর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, `ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের বসবাসের দীর্ঘ পথে তারকাঁটা নেই। অনেক জায়গায় জঙ্গল এলাকা। অনেক সময় রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে দালালদের মাধ্যমে পালিয়ে যাচ্ছে। আমরা সর্বোচ্চ পাহারা দিয়ে রোহিঙ্গাদের পালিয়ে যাওয়া রোধ করতে চেষ্টা করছি।’ তবে থানার লোকবল কম থাকায় সব সময় রোহিঙ্গাদের নজরদারি করা সম্ভব হয়ে ওঠে না বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

সন্দ্বীপ থানার অফিসার ইনচার্জ বসির আহাম্মদ খান জানান, গত এক মাসে ৪০ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে। এরা সবাই ভাসানচরের রোহিঙ্গা। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে চার দফায় ভাসানচর থেকে পালিয়ে আসা ৬২ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে ১৭ জুলাই ২০ জন, ১১ জুলাই ১৮ জন, ২২ জুন ১৪ জন এবং ৩০ মে ৩ দালালসহ ১০ জন, ১৭ জুলাই ১১টি শিশুসহ ২০ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়।  তাদের বিরুদ্ধে জোরারগঞ্জ থানায় মামলা  দায়ের করা হয়েছে। তারা ভাসানচর থেকে কুতুপালংয়ে যাওয়ার উদ্দেশে বের হয়েছিল বলে জানা গেছে।

শরণার্থী ও ত্রাণ প্রত্যাবাসন কমিশনের ভাসানচরের স্থানীয় প্রতিনিধি শংকর বিশ্বাস আজকের পত্রিকাকে বলেন, `এখানে অনেক ঘটনা আছে, আপনারা এখানে আসেন। মোবাইলে এসব কথা বলা যাবে না।’

এদিকে গত ২ জুলাই মৌলভীবাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে ১৪ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়। জানা যায়, ২৭ জুন চট্টগ্রাম থেকে এই ১৪ জন রোহিঙ্গা কাজের খোঁজে মৌলভীবাজারে যায়। কাজ না পেয়ে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সন্দেহজনক ঘোরাফেরা করলে তাদের  আটক করা হয়। এদিকে গত ১১ জুন ভাসানচরের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসা নারী, পুরুষ, শিশুসহ ১২ রোহিঙ্গাকে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ থেকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে স্থানীয়রা। এদিন ভোরে উপজেলার চরএলাহী ইউনিয়নের দক্ষিণ ঘাট থেকে স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাদের আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।

জানা যায়, ১০ জুন দিবাগত রাতে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ভাড়া করে কক্সবাজারে তাদের পুরাতন ক্যাম্পের উদ্দেশে  ভাসানচর থেকে রওনা দেয়। নৌকার মাঝি রাতের বেলা তাদের চরএলাহী ঘাটে নামিয়ে চলে যান। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় পুলিশ তাদের আটক করে। এ প্রসঙ্গে নোয়াখালীর পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন আজকের পত্রিকাকে জানান, `রোহিঙ্গারা ভাসানচর থেকে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি আমাদের নজরে আসছে। বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। এ জন্য আমরা পুলিশ কোস্টগার্ড ও এপিবিএন নিয়ে কঠোর নজরদারি রাখছি।’

গত ১৮ জুন চট্টগ্রামের সন্ধীপ উপজেলার পশ্চিম মুছাপুর স্লুইসগেইট থেকে ৯ জন রোহিঙ্গাকে আটক করেছে স্থানীয় লোকজন। এদিন সকালে স্থানীয় লোকজন রোহিঙ্গাদের আটক করে সন্ধীপ থানার পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ এসে রোহিঙ্গাদের থানায় নিয়ে যায়।আটক ৯ রোহিঙ্গার মধ্যে দুজন পুরুষ, চারজন নারী, তিনজন শিশু রয়েছে। এ নিয়ে পঞ্চম ধাপে মোট ৩৯ জন রোহিঙ্গা সন্ধীপের স্থানীয় লোকজনের হাতে আটক হয়। এ ছাড়া গত ১৮ মে ভাসানচর থেকে পালিয়ে আসা ১১ জন রোহিঙ্গাকে সন্দ্বীপ উপকূলে আটক করেছে স্থানীয় জনগণ। ওই দিন ভোর ৫টার দিকে সন্দ্বীপের পশ্চিমে মেঘনা চ্যানেল পাড়ি দিয়ে দ্বীপের রহমতপুর উপকূলে পৌঁছালে স্থানীয় জেলেদের সহায়তায় পুলিশ তাদের আটক করে । আটক রোহিঙ্গাদের মধ্যে একজন দালাল ছাড়াও এক পরিবারেরই ৯ জন সদস্য রয়েছে। তাদের মধ্যে তিনটি শিশু ও ছয় নারী রয়েছেন। এ ছাড়া দলে আছেন আরও একজন যুবক। আটক ইয়াছিন আরাফাত (২৫) নামের দালালের সঙ্গে ২ লাখ ৫৫ হাজার টাকার বিনিময়ে তাঁদের কক্সবাজারে পৌঁছে দেওয়ার চুক্তি হয়েছিল। এক বছর আগে কুতুপালং থেকে ভাসানচর ক্যাম্পে স্থানান্তর করা হয়েছিল এই শরণার্থীদের।

প্রসঙ্গত,  গত বছরের ৪ ডিসেম্বর থেকে কয়েক দফায় ১৮ হাজার ৩০০ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তর করা হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :