বন্ধুর জানাজায় সুধীর বাবু, কান্নার ছবি ভাইরাল

প্রকাশিত : ৯ সেপ্টেম্বর ২০২১

ভোরের দর্পণ ডেস্ক:

বন্ধুত্ব অমলিন, এই সম্পর্কে নেই জাত কিংবা ধর্মের ভেদ। এই সম্পর্কটি যে কতটা গভীর হতে পারে তারই অনন্য এক উদাহরণ দেখালেন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের গুণবতীর সুধীর বাবু।

তিনি একজন হিন্দু। তার বন্ধু আমীর হোসেন সওদাগর মুসলিম ধর্মের অনুসারী।

গত মঙ্গলবার রাতে বার্ধক্যজনিত রোগে মৃত্যুবরণ করেন আমীর হোসেন। বন্ধুর মৃত্যুর খবরে শোকে কাতর হয়ে পড়েন দীর্ঘ দিনের সাথী সুধীর বাবু। বন্ধুর বিদায় বেলায়ও তার সঙ্গ ছাড়েননি সুধীর বাবু। জানাজার নামাজে অংশ না নিলেও মাঠে এসে উপস্থিত হয়েছেন তিনি। বন্ধু হারানোর বেদনায় সুধীর বাবু নামাজ চলাকালীন জানাজাস্থলের পেছনে গাছের গুঁড়িতে বসে চোখের পানি ফেলতে থাকেন। বিষয়টি উপস্থিত সব মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে। হৃদয়স্পর্শী ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা হলে মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার গুণবতী বাজারের ব্যবসায়ী আমীর হোসেন সওদাগর ও সুধীর বাবু শিশুকালের বন্ধু। আমীর হোসেন সওদাগর দীর্ঘ দিন ধরে মুদি দোকানের ব্যবসা রতেন। সুধীর বাবুও ব্যবসা করতেন গুণবতী বাজারে। গত মঙ্গলবার রাতে বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান আমীর হোসেন। বন্ধুর মৃত্যুর খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শোকে কাতর হয়ে পড়েন সাথী সুধীর বাবু।

জানাজা শেষে উপস্থিত সকলে তার এ অকৃত্রিম ভালোবাসা দেখে আবেগআপ্লুত হন। তার কান্নার সেই ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুকে পোস্ট করা হলে মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। ছড়িয়ে যায় জেলার গন্ডি পেরিয়ে সারা বাংলাদেশে। এমনকি ভারতেও। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বন্ধুত্ব এমনই হওয়া উচিত বলে উল্লেখ করেন ফেসবুকে ব্যবহারকারীরা। অনেকে আবার লিখেছেন, সত্যিকারের বন্ধুত্ব আসলেই এমন হয়। যে বন্ধুত্ব জাত দেখে না। ধর্ম দেখে না। ধনী-গরীবের ভেদাভেদ চেনে না।

এ ব্যাপারে গতকাল বৃহস্পতিবার সুধীর বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে দেখা গেছে, তিনি তখনও কাঁদছেন তার বন্ধুর জন্য। তার বয়সও পঁচাত্তর পেরিয়েছে। বয়সের ভারে অনেকটা ন্যূজ হয়ে গেছেন। চলতেও পারেন না ঠিকমত। বন্ধু মারা যাবার খবরে ঘরে থাকতে পারেননি তিনি। ছুটে গেছেন বন্ধু অমীর হোসেনের বাড়ি। সেখান থেকে জানাজার স্থান ও পরে কবরস্থা পর্যন্ত যান তিনি। ধর্মীয় কোনো কিছুতে অংশ না নিলেও সব কর্মকাণ্ডেই শেষ পর্যন্ত থাকেন সুধীর বাবু। তিনি নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত। কথাও বলতে পারেন না ঠিক মতো। মুখের কথাগুলো কেমন যেন জড়িয়ে যায়।

কাঁদতে কাঁদতেই কথা বলেন সুধীর বাবু। তিনি বলেন, ‘গুণবতী প্রাইমারী স্কুলে আমরা একই সাথে পড়ালেখা করেছি। সেই শিশুকাল থেকে বন্ধুত্ব শুরু হয় আজও আছে। আমি হিন্দু, আমীর হোসেন মুসলমান এটা কখনো ভাবিনি। সবার আগে মানুষ হিসেবেই ভেবেছি নিজেদের। আমাদের মধ্যে জীবনে কখনো একমূহুর্তের জন্য ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি হয়নি। এমনকি মনেও আসেনি। তার এ মৃত্যুকে অমি সহজভাবে মেনে নিতে পারছি না। আমি খুবই কষ্ট পাচ্ছি। এ কষ্ট বলে বোঝানো যাবে না। একদিন কেই কাউকে না দেখলে ব্যকুল হয়ে যেতাম।

সুধীর বাবু বলেন, ‘অমরা একই সাথে ব্যবসা করেছি। দশ টাকা লাভ হলে পাঁচ টাকা আমি আর পাঁচ টাকা আমীর হোসেন নিয়েছে। কোনো দিন মনোমালিন্য হয়নি। পরে ব্যবসা বড় হওয়ায় যার যার ব্যবসা আলাদা হয়েছে ঠিকই কিন্তু অমাদের সম্পর্ক আলাদা হয়নি। আমাদের যারই সমস্যা হতো একে অপরের কাছে পরামর্শ নিতাম। এখন আমি একা হয়ে পড়েছি।’ এ বলে আবারও হু হু করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন সুধীর বাবু।

আপনার মতামত লিখুন :