করোনা আক্রান্তের হারেও রেকর্ড, তবুও স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা নেই

প্রকাশিত : ১ এপ্রিল ২০২১

ভোরের দর্পণ ডেস্ক:

 

দেশে ফের হু হু করে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মৃত্যুও। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৪৬৯ জন। এটি দেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ শনাক্ত।

গত ২৪ ঘণ্টায় রোগী শনাক্তের হার ২২.৯৪ শতাংশ, এখন পর্যন্ত শনাক্তের হার ১৩.১৫ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার ৮৮.২১ শতাংশ এবং শনাক্ত বিবেচনায় মৃত্যুহার ১.৪৭ শতাংশ।

দেশের করোনার এই পরিস্থিতিতেও স্বাস্থ্যবিধির কোনো কিছুই মানছেন না বেশিরভাগ মানুষ। বাহিরে সাধারণ মানুষের সমাগম আর চলাফেরার দৃশ্য দেখে মনে হয় করোনাকে তোয়াক্কাই করছেন না কেউ। অধিকাংশ মানুষকে দেখা গেছে মাস্ক পরা ছাড়াই চলাফেরা করছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখিন হতে হবে বাংলাদেশকে।

করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকায় হাসপাতালে দেখা দিয়েছে আইসিইউ ও সাধারণ কোভিড রোগীদের চিকিৎসা সংকট- এ পরিস্থিতিতে চারটি শর্ত না মানলে সংক্রমণ কমানো সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও ইউজিসি (ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন) অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ।

শর্তগুলো হচ্ছে- ১. সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে মাক্স ব্যবহার করা ২. সামাজিক দূরত্ব কঠোরভাবে বজায় রাখা ৩. স্বাস্থ্যবিধি সর্বতোভাবে পালন করা এবং ৪. সবার করোনার টিকা গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক।

এদিকে সরকারও করোনা সংক্রমণ বাড়ায় ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করেছে। এতে বলা হয়েছে,

 

সব ধরনের জনসমাগম (সামাজিক/রাজনৈতিক/ধর্মীয়/অন্যান্য) সীমিত করতে হবে। উচ্চ সংক্রমণের এলাকায় সব ধরনের জনসমাগম নিষিদ্ধ থাকবে। বিয়ে/জন্মদিনসহ যে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান উপলক্ষে জনসমাগম নিরুৎসাহিত করতে হবে।মসজিদসহ সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে। পর্যটন/বিনোদন কেন্দ্র/সিনেমা হল/থিয়েটার হলে জনসমাগম সীমিত করতে হবে এবং সব ধরনের মেলা আয়োজন নিরুৎসাহিত করতে হবে। গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে এবং ধারণ ক্ষমতার ৫০ শতাংশের বেশি যাত্রী পরিবহন করা যাবে না। সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকির এলাকায় আন্তঃজেলা যান চলাচল সীমিত করতে হবে; প্রয়োজনে বন্ধ রাখতে হবে। বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের ১৪ দিন প্রাতিষ্ঠানিক (হোটেলে নিজ খরচে) কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে হবে। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য খোলা/উন্মুক্ত স্থানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কেনা-বেচার ব্যবস্থা করতে হবে, ওষুধের দোকানেও যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবার প্রতিষ্ঠানগুলোতে মাস্ক পরাসহ যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে। শপিং মলে ক্রেতা-বিক্রেতা সবাইর যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাদ্রাসা, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়) ও কোচিং সেন্টার বন্ধ থাকবে। অপ্রয়োজনীয় ঘোরাফেরা/আড্ডা বন্ধ করতে হবে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া রাত ১০টার পর বাইরে বের হওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রয়োজনে বাইরে গেলে মাস্ক পরাসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে। মাস্ক না পরলে কিংবা স্বাস্থ্যবিধি না মানলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বা লক্ষণযুক্ত ব্যক্তির আইসোলেশন নিশ্চিত করতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা অন্যদেরও কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে হবে। জরুরি সেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া সব সরকারি-বেসরকারি অফিস/প্রতিষ্ঠান/ শিল্প কারখানায় পরিচালনা করতে হবে অর্ধেক জনবল দিয়ে। গর্ভবতী/ অসুস্থ/ ৫৫ বছরের বেশি বয়সী কর্মীদের বাড়িতে থেকে কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। সভা, সেমিনার, প্রশিক্ষণ কর্মশালা যথাসম্ভব অনলাইনে আয়োজনের ব্যবস্থা করতে হবে। সশরীরে উপস্থিত হতে হয়- এমন যে কোনো ধরনের গণপরীক্ষার ক্ষেত্রে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে।  হোটেল-রেঁস্তোরায় ৫০ শতাংশ আসনের বেশি মানুষ বসানো যাবে না। কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ এবং অবস্থানকালে বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক পরা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে।

 

কিন্তু সাধারণ মানুষ সরকারের এসব নির্দেশনা মানা তো দূরের কথা, ভ্রুক্ষেপই করছেন না।

খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বুধবার (৩১ মার্চ) এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় শংকা প্রকাশ করে বলেছেন, প্রতিদিন যদি ৫০০-১০০০ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে থাকে তাহলে গোটা ঢাকা শহরকে হাসপাতাল করে ফেললেও রোগী রাখার জায়গা দেওয়া যাবে না। এ জন্য যা করার এখনই করতে হবে। তিনি আরও বলেন, এই মুহূর্তে যা করতে হবে তা হচ্ছে, যে যে স্থান থেকে করোনা সৃষ্টি হচ্ছে সে সব স্থানে এখনই জরুরি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। সবাইকে প্রধানমন্ত্রীর ১৮টি নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে দেশে এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৮৪৭ জন পুরুষের মৃত্যু হয়েছে, আর নারী মারা গেছেন দুই হাজার ২৫৮ জন। যা শতকরা হিসাবে পুরুষ ৭৫ দশমিক ২০ শতাংশ এবং নারী ২৪ দশমিক ৮০ শতাংশ।

দেশে গত বছর ৮ মার্চ করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ে। ওই সময় হু হু করে বাড়তে থাকলেও এক পর্যায়ে ধীরে ধীরে আক্রান্ত ও মৃত্যু কমতে থাকে। কিন্তু চলতি বছরের মার্চ থেকে আবারও সংক্রমণ ঊর্ধ্বগতি শুরু হয়। গত সোমবার (২৯ মার্চ) প্রথমবারের মতো এক দিনে ৫ হাজারের বেশি নতুন রোগী শনাক্তের খবর আসে। তার মধ্য দিয়ে দেশে মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছয় লাখ ছাড়িয়ে যায়। এর তিন দিনের মাথায় দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৬ হাজারও ছাড়িয়ে গেল।

 

সূত্র: যুগান্তর প্রতিবেদন

আপনার মতামত লিখুন :